বাহিরে জলরাশি, ভেতরে আতঙ্ক ও ভুলে ভরা প্রশ্নপত্র: সংকটে বিপন্ন এইচএসসি
প্রতিদিনের কণ্ঠস্বর ডেক্সঃ
- প্রকাশিত : ১৫ জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
জেনারেট ফটোকার্ড
প্রফেসর ড. আসিফ মিজান, উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয় (সোমালিয়া) এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অপরাধ বিশ্লেষক।
বাহিরে ৭২ ঘণ্টার বৈরী আবহাওয়ার সতর্কতা, রাজপথে প্রমত্তা নদী সদৃশ জলরাশি, আর ভেতরে পরীক্ষা হলের কৃত্রিম নজরদারি ও ‘সাইলেন্ট এক্সপেল’-এর মনস্তাত্ত্বিক আতঙ্ক—এই দুই সংকটের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে গেল দেশের অন্যতম বৃহত্তম পাবলিক পরীক্ষা উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) ও সমমান পরীক্ষা। জলমগ্ন জনপদ, ত্রুটিপূর্ণ প্রশ্নপত্র এবং মানবিকতাবর্জিত প্রশাসনিক জেদের কারণে এই পরীক্ষা গ্রহণ প্রক্রিয়াটি শেষ পর্যন্ত একটি জাতীয় ট্র্যাজেডিতে রূপান্তরিত হয়েছে। একজন সাধারণ রিকশাচালক কিংবা প্রান্তিক চা-বিক্রেতার যে সহজাত কাণ্ডজ্ঞান (Common Sense) দিয়ে অনুধাবন করতে পেরেছিলেন—দুর্যোগের এই মহাসংকটে পরীক্ষা নেওয়ার মতো ন্যূনতম পরিবেশ নেই; রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারক ও শিক্ষা প্রশাসন সেই দৃশ্যমান সত্যকে অস্বীকার করে এক প্রকার লঙ্কাকাণ্ড বাঁধিয়ে দিলেন।
রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্বগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রধান হলো নাগরিকদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, যা অপরাধবিজ্ঞানের ‘সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট থিওরি’ (Social Contract Theory) বা সামাজিক চুক্তি তত্ত্বের মূল ভিত্তি। অথচ সমকালীন বাংলাদেশে চরম প্রতিকূল আবহাওয়া এবং দেশব্যাপী ইমার্জেন্সির মধ্যে যেভাবে জোরপূর্বক পরীক্ষা গ্রহণ করা হয়েছে, তা এই সামাজিক চুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। অপরাধবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে এটিকে রাষ্ট্র ও শিক্ষা প্রশাসন কর্তৃক শিক্ষার্থীদের জীবনকে এক চরম কাঠামোগত নিরাপত্তা ঝুঁকির (Structural Vulnerability) মুখে ঠেলে দেওয়ার শামিল বলা চলে।
পরিসংখ্যানের বাস্তবচিত্র ও মাঠপর্যায়ের ট্রমা
আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির প্রাতিষ্ঠানিক তথ্যানুযায়ী, গত ১৩ জুলাই অনুষ্ঠিত হওয়া এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ষষ্ঠ দিনে বৈরী আবহাওয়ার কারণে দেশের ১০টি শিক্ষা বোর্ডে মোট ১৯ হাজার ৫৯২ জন পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিলেন। সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলোর মধ্যে কেবল ঢাকা বোর্ডেই সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৩৪৪ জন শিক্ষার্থী কেন্দ্রে উপস্থিত হতে পারেননি। ওপেন সোর্স এবং বিভিন্ন জাতীয় গণমাধ্যমের সচিত্র প্রতিবেদন ও সোশ্যাল মিডিয়ার নির্ভরযোগ্য উপাত্ত থেকে দেখা যাচ্ছে, হাজার হাজার শিক্ষার্থী কোমর সমান পানি এবং অবিরাম বর্ষণ ডিঙিয়ে পরীক্ষা কেন্দ্রে পৌঁছাতে বাধ্য হয়েছেন। কারও প্রবেশপত্র ভিজে নষ্ট হয়েছে, আবার অসংখ্য পরীক্ষার্থী সম্পূর্ণ ভেজা পোশাকে টানা তিন ঘণ্টা পরীক্ষা দিয়েছেন। শত শত শিক্ষার্থী তীব্র মানসিক ট্রমা ও শারীরিক অবসাদ নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন এবং পরদিনই বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী তীব্র জ্বরে আক্রান্ত হয়েছেন বলে অভিভাবক মহল থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে।
এর সাথে যুক্ত হয়েছে পরীক্ষা হলের ভেতরের তীব্র মনস্তাত্ত্বিক নিপীড়ন। কোটি কোটি টাকা খরচ করে সিসি ক্যামেরা বসিয়ে শিক্ষকদের আসামির মতো আতঙ্কে রেখে পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে। আতঙ্কিত শিক্ষকগণ পরীক্ষার্থীদের বার বার হুমকি দিচ্ছেন—একটু নড়াচড়া করলেই ‘সাইলেন্ট এক্সপেল’ করা হবে। অথচ এর বিপরীতে প্রশ্নপত্র ছিল ভুলে ভরা, যে মৌলিক ও বেসিক চ্যাপ্টারগুলো থেকে প্রশ্ন থাকার কথা, তা অনুপস্থিত। এমন ত্রুটিপূর্ণ প্রশ্নপত্র ও ভীতিকর পরিবেশে কোনো শিক্ষার্থীর পক্ষেই তার মেধার যৌক্তিক ও স্বাভাবিক প্রতিফলন ঘটানো সম্ভব নয়।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও অপরাধবৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ (Criminological Perspective)
অপরাধবিজ্ঞানের ‘ভিকটিমোলজি’ (Victimology) এবং ‘স্টেট ক্রাইম’ (State Crime) তত্ত্বের নিরিখে যখন একটি রাষ্ট্রযন্ত্র প্রতিকূল পরিস্থিতি জেনেও কোনো জনগোষ্ঠীর ওপর জবরদস্তিমূলক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয় এবং তার ফলে সেই জনগোষ্ঠী শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন তা এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সহিংসতা বা কাঠামোগত সহিংসতা (Structural Violence) হিসেবে গণ্য হয়।
বিশ্বের উন্নত ও সভ্য রাষ্ট্রগুলোর দিকে তাকালে আমরা এর সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র দেখতে পাই। উদাহরণস্বরূপ:
যুক্তরাজ্য (UK): যুক্তরাজ্যের কোনো পাবলিক পরীক্ষার সময় যদি চরম আবহাওয়া (যেমন অতিরিক্ত তুষারপাত বা বন্যা) তৈরি হয়, তবে ব্রিটিশ কাউন্সিল বা সংশ্লিষ্ট বোর্ড (যেমন- AQA, Pearson) অনতিবিলম্বে পরীক্ষা স্থগিত করে এবং ‘Special Consideration’ পলিসির আওতায় পরীক্ষার্থীদের বিকল্প মূল্যায়ন বা গড় নম্বরের আইনি সুবিধা দেয়।
যুক্তরাষ্ট্র (USA): মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কোনো অঙ্গরাজ্যে প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিলে College Board তাৎক্ষণিকভাবে SAT বা AP পরীক্ষা পুনঃতফসিল করে এবং শিক্ষার্থীদের সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
জাপান: ভূমিকম্প বা টাইফুনের মতো দুর্যোগে জাপানের শিক্ষা মন্ত্রণালয় (MEXT) কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর না করে স্থানীয় প্রশাসনকে পরীক্ষা স্থগিতের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দেয়।
আমাদের দেশে শিক্ষা প্রশাসনের মূল ফোকাস এখনও পড়ে আছে কেবল ‘নকল মুক্ত’ পরীক্ষা ব্যবস্থার ওপর। নকলের যুগ তো বহু আগেই পার হয়েছে। আজকের সংকট লেখাপড়ার মানোন্নয়নে, যোগ্য নাগরিক গড়ে তোলায়। অথচ সেই মূল দায়িত্ব এড়িয়ে আমলাতান্ত্রিক ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর (ডিসি, এসপি) দেওয়া একপেশে রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে জননিরাপত্তার মতো সংবেদনশীল বিষয়ের মূল্যায়ন করা হচ্ছে, যা এক প্রকার কৌশলগত দেউলিয়াত্ব।
বিদ্যমান সংকট থেকে উত্তরণে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনাঃ
তাত্ত্বিক, অপরাধ বিজ্ঞানী ও উপাচার্য হিসেবে এই দুর্যোগপূর্ণ মুহূর্তে রাষ্ট্র এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতি জরুরি ভিত্তিতে নিম্নোক্ত ৫ দফা দাবি ও পদক্ষেপ গ্রহণের উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি:
১. বিকল্প মূল্যায়ন ও পুনঃপরীক্ষা:
গত ১৩ তারিখের বিতর্কিত পরীক্ষাটি সম্পূর্ণ বাতিল ঘোষণা করতে হবে। বৈরী আবহাওয়ার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের স্বার্থ রক্ষার্থে হয় এভারেজ বা গড় নম্বর প্রদান করতে হবে, না হয় বিকল্প প্রশ্নপত্রে পুনরায় পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ দিতে হবে।
২. প্রশ্নপত্রের দায় ও জবাবদিহিতা:
বিগত সরকারের তৈরিকৃত প্রশ্নপত্র কোনো রকম পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই-বাছাই ও পরিমার্জন ছাড়া পরীক্ষা হলে পাঠানোর সাথে সংশ্লিষ্ট সকল কর্মকর্তা ও প্রশ্ন মডারেটরদের অনতিবিলম্বে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।
৩. পরীক্ষার পুনঃতফসিলিকরণ (Rescheduling):
দেশের বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত চলমান পরীক্ষা সাময়িকভাবে স্থগিত রেখে, শিক্ষার্থীদের মানসিক প্রস্তুতি ও যাতায়াতের জন্য পর্যাপ্ত সময় দিয়ে নতুন রি-শিডিউল ঘোষণা করতে হবে।
৪. শিক্ষার্থীবান্ধব দৃষ্টিভঙ্গি:
পরীক্ষার্থীদের প্রতিপক্ষ না বানিয়ে শিক্ষা প্রশাসনকে তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। তাদের বক্তব্য শুনতে হবে এবং সত্যিকারের অভিভাবকের মতো সংবেদনশীল আচরণ করতে হবে।
৫. অপশক্তির মূলোৎপাটন:
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা বোর্ডগুলোতে পূর্ববর্তী আমলের যেসব সরকারবিরোধী ও জনস্বার্থবিরোধী অপশক্তি ঘাপটি মেরে বসে থেকে সরকারকে বিব্রত করার জন্য এমন হঠকারী সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করছে, তাদের অতিসত্বর চিহ্নিত করে অপসারণ ও কঠোর শাস্তির মুখোমুখি করতে হবে।
শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হলো মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ ও যোগ্য নাগরিক গড়ে তোলা। মেধা মূল্যায়নের পদ্ধতি যদি শিক্ষার্থীর জন্য জীবননাশের বা দীর্ঘমেয়াদী ট্রমার কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তবে সেই ব্যবস্থার উপযোগিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। আশা করি, শিক্ষা প্রশাসন আমলাতান্ত্রিক অহমিকা পরিহার করে অনতিবিলম্বে শিক্ষার্থীদের বৃহত্তর সুরক্ষায় প্রাজ্ঞ ও সংবেদনশীল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন।
লেখক: - প্রফেসর ড. আসিফ মিজান, উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয় (সোমালিয়া) এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অপরাধ বিশ্লেষক।
আপনার মতামত লিখুন :