নেত্রকোনায় পরিবেশ ও কৃষিতে অবদানের স্বীকৃতি পেলেন ২৫ নারী


FavIcon
প্রতিদিনের কণ্ঠস্বর ডেক্সঃ
  • প্রকাশিত : ১৬ অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
জেনারেট ফটোকার্ড

ছবির ক্যাপশন:



মোঃ নাজমুল ইসলাম 
নেত্রকোণা প্রতিনিধি

‘নারীর জ্ঞান যত্নে বাঁচাও, পরিবেশের প্রাণ’ স্লোগান সামনে রেখে নেত্রকোনায় ২৫ জন নারীকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের জন্য গ্রামীণ নারী সম্মাননা দেওয়া হয়েছে। কৃষি-বাস্তুসংস্থান চর্চা, প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণ, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, জলবায়ু অভিযোজন ও পরিবেশ সুরক্ষায় ভূমিকার স্বীকৃতিস্বরূপ ১৫টি বিভাগে তাঁদের এ সম্মাননা দেওয়া হয়।

বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) সকাল ১০টায় নেত্রকোনা সদর উপজেলার কাইলাটি ইউনিয়নের কুতুবপুর গ্রামে মাসুদ মিয়ার এগ্রোইকোলজি লার্নিং সেন্টারে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিক ও নেত্রকোনা জেলা গ্রিন কোয়ালিশন কমিটি। আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবস ২০২৬ উদ্‌যাপন উপলক্ষে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে সম্মাননা প্রদান ছাড়াও গ্রামীণ নারীদের উৎপাদিত পণ্যের মেলা, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

এ বছরের প্রতিপাদ্য ছিল ‘গ্রামীণ নারীর উত্থান: বেইজিং+৩০-এর মাধ্যমে সহনশীল ভবিষ্যৎ নির্মাণ’।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট খন্দকার মুশফিকুর রহমান। বিশেষ অতিথি ছিলেন জেলা মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ফাহমিদা সুলতানা এবং যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের উপপরিচালক ফারজানা সুলতানা। অনুষ্ঠানে কৃষি কর্মকর্তা, সাংবাদিক, গবেষক, সাংস্কৃতিক কর্মী, কৃষক-কৃষাণি ও তরুণেরা উপস্থিত ছিলেন। সভাপতিত্ব করেন জেলা গ্রিন কোয়ালিশন কমিটির সহসভাপতি ও সাংবাদিক আলপনা বেগম এবং কাইলাটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নাজমুল হক।

অনুষ্ঠানস্থলে আয়োজিত গ্রামীণ নারীদের মেলায় স্থানীয় বীজবৈচিত্র্য, অচাষকৃত খাদ্য, নিরাপদ শাকসবজি, কুটিরশিল্প, স্থানীয় ফল, প্রাণিসম্পদ, জৈব বালাইনাশক, রাসায়নিক কৃষির ক্ষতিকর দিক, হাওরাঞ্চলে জলবায়ু অভিযোজন কৌশল এবং গ্রামীণ নারীদের পিঠার বৈচিত্র্য তুলে ধরা হয়। বিভিন্ন স্টলে নারীরা তাঁদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, স্থানীয় জ্ঞান ও পরিবেশবান্ধব কৃষিচর্চা প্রদর্শন করেন। আশপাশের গ্রামের নারী-পুরুষ, কৃষক ও তরুণেরা মেলা পরিদর্শন করেন।

আয়োজকেরা জানান, কৃষি-বাস্তুসংস্থানভিত্তিক চাষাবাদ, প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণ, খাদ্য সার্বভৌমত্ব, টেকসই কৃষি, জলবায়ু অভিযোজন, বিষমুক্ত কৃষিচর্চা, বীজের বৈচিত্র্য সংরক্ষণ, জলবায়ু-সহনশীল ধানের জাত উদ্ভাবন, কমিউনিটি বীজ ব্যাংক, জৈব পদ্ধতিতে বালাই দমন, বৃক্ষরোপণ, মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষা, পাখি সংরক্ষণ, বৈচিত্র্যময় খাদ্যব্যবস্থা, পরিবেশ রক্ষায় নারীর নেতৃত্ব, ঔষধি উদ্ভিদ ও প্রাচীন গাছ সংরক্ষণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের জন্য ১৫টি বিভাগে সম্মাননা দেওয়া হয়েছে।

সম্মাননাপ্রাপ্তদের মধ্যে রয়েছেন কাজলা আক্তার, মমতা আক্তার, জান্নাতুল, অঞ্জনা রাণী কর্মকার, পারভীন আক্তার, মর্জিনা বেগম, প্রিয়া আক্তার, হোসনা আক্তার, জহুরা আক্তার, আম্বিয়া বেগম, মদিন আক্তার, কল্পনা, ফাতেমা, স্বপ্না, রূপতারা, রহিমা, কবিতা, আছিয়া, নাসরিন আক্তার, সনি রাণী দাস, হাওয়া আক্তার, কামরুন্নাহার লিপি, তৃতীয় লিঙ্গের শাহনাজ পারভীন রুপালি ও ইকরা জাহানসহ অন্যরা।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, যুগে যুগে গ্রামীণ নারীদের হাত ধরেই কৃষি, পরিবেশ, প্রতিবেশ ও জীবনযাপনের বৈচিত্র্যময় সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। তাঁদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এ জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা যথাযথ স্বীকৃতি পায়নি।

তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত সংকট মোকাবিলায় গ্রামীণ নারীদের নেতৃত্ব এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। গ্রামীণ ও প্রান্তিক নারীদের তথ্যপ্রযুক্তির আওতায় আনার পাশাপাশি তাঁদের প্রতি পারিবারিক ও সামাজিক সহিংসতা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা জরুরি।

আলোচনায় বক্তারা বলেন, বীজ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ, ফসল উৎপাদনে সহায়তা, শস্য মাড়াই, বাছাই, শুকানো ও প্রক্রিয়াজাতকরণসহ কৃষির বিভিন্ন পর্যায়ে গ্রামীণ নারীদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তাঁরা স্থানীয় বীজ, খাদ্য ও কৃষিজীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করে আসছেন। তবে আধুনিক কৃষিব্যবস্থার বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে বীজ সংরক্ষণ, বিনিময় ও কৃষিসম্পদের ওপর নারীদের নিয়ন্ত্রণ অনেক ক্ষেত্রে কমেছে।
বক্তারা আরও বলেন, অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার মাটি ও পানিদূষণের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। এর ক্ষতিকর প্রভাব থেকে গ্রামীণ নারীদের সুরক্ষা দিতে পরিবেশবান্ধব কৃষিচর্চা সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি দুর্যোগের সময় পরিবার ও গৃহপালিত প্রাণী রক্ষায় নারীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার স্বীকৃতি দিতে হবে। কৃষিকাজে নিয়োজিত নারীদের প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কৃষক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া এবং তাঁদের নামে কৃষি কার্ড ও সরকারি প্রণোদনা বরাদ্দের দাবি জানান তাঁরা।

বক্তারা বলেন, কৃষি-বাস্তুসংস্থানভিত্তিক চর্চা দীর্ঘমেয়াদি খাদ্যনিরাপত্তা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সহায়তা করে। এ ক্ষেত্রে গ্রামীণ নারীদের জ্ঞান, নেতৃত্ব ও উদ্ভাবনকে স্বীকৃতি দেওয়া হলে পরিবেশ সংরক্ষণের পাশাপাশি নারীর ক্ষমতায়নও ত্বরান্বিত হবে।

আলোচনা শেষে সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি হয়।


ad728

আলোচিত শীর্ষ ১০ সংবাদ