মানিক লাল ঘোষ
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও অর্জনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা দেশের সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রমের ওপর আরোপিত অসাংবিধানিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবিতে জাতিসংঘের দ্বারস্থ হয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা।
শেখ হাসিনার নির্দেশে তাঁর আন্তর্জাতিক আইনি প্রতিনিধি দল 'ডাউটি স্ট্রিট চেম্বার্স'-এর জ্যেষ্ঠ আইনজীবী স্টিভেন পাওয়েলস কেসি (Steven Powles KC) জাতিসংঘের বিশেষ বিশেষজ্ঞদের কাছে সরাসরি এ সংক্রান্ত লিখিত আবেদন জমা দেন। চিঠিটি গ্রহণকারী বিশেষজ্ঞদের মধ্যে রয়েছেন শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও সংগঠনের স্বাধীনতার অধিকার সংক্রান্ত বিশেষ র্যাপোর্টার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বিষয়ক বিশেষ র্যাপোর্টার এবং সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় মানবাধিকার রক্ষা বিষয়ক বিশেষ র্যাপোর্টার। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত এই আবেদনের খবর এবং শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের সম্ভাব্য নিকটবর্তী সময়ে এমন দূরদর্শী পদক্ষেপ বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক ঐতিহাসিক মোড় এনে দিয়েছে।
আইনি ও রাজনৈতিক যুক্তি
চিঠিতে অত্যন্ত স্পষ্ট ও যুক্তিনির্ভরভাবে তুলে ধরা হয়েছে কীভাবে ক্ষমতার পালাবদলের পর আইন ও সংবিধানকে তোয়াক্কা না করে একপাক্ষিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। প্রকাশিত তথ্যে উঠে আসে, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাজনৈতিক প্রতিহিংসাবশত এই বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নেয়। শেখ হাসিনা স্মর করিয়ে দেন—মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সংগঠন করার অধিকার এবং যেকোনো রাজনৈতিক দলের স্বাভাবিক কার্যক্রম চালানোর সুযোগ বাংলাদেশের সংবিধানে স্বীকৃত মৌলিক অধিকার। দেশের কোটি কোটি মানুষের প্রতিনিধিত্বকারী বৃহত্তম দলটিকে বাদ দিয়ে কোনো নির্বাচন কখনোই গ্রহণযোগ্য বা অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে পারে না।
মানবাধিকার লঙ্ঘন ও প্রেক্ষাপট
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, শুধু নিষেধাজ্ঞা আরোপ নয়, বরং দলটির লক্ষ লক্ষ নেতা-কর্মী ও সমর্থক আজ চরম রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘন ও মানবেতর জীবনের মুখোমুখি। পরবর্তীতে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও তাঁর জোট নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে এই নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখার পক্ষপাতিত্ব করে এবং একটি আওয়ামী লীগবিহীন প্রেক্ষাপট তৈরি করে।
এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে নির্বাচনি প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা হয়। ফলস্বরূপ, একটি প্রতিনিধিত্বহীন পরিবেশে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন ও সরকার গঠন করে। আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনকে গণতন্ত্রের জন্য একটি কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান
চিঠিতে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়, দেশে প্রকৃত বাকস্বাধীনতা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ফিরিয়ে আনতে হলে প্রথম পদক্ষেপই হতে হবে আওয়ামী লীগের ওপর থেকে অসাংবিধানিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার। আন্তর্জাতিক চাপ ও জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের হস্তক্ষেপে এই অন্যায় নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে দেশে একটি অবাধ, নিরপেক্ষ ও সর্বদলীয় অংশগ্রহণে সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টিতে প্রকাশ্য বিবৃতি প্রদানের আহ্বান জানানো হয়েছে।
(লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক; সাবেক সহ-সভাপতি, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন)
আপনার মতামত লিখুন :