গণতন্ত্র, রাজনীতি ও ক্ষমতার মোহ: রাষ্ট্রচিন্তার এক চিরন্তন সংকট


FavIcon
প্রতিদিনের কণ্ঠস্বর ডেক্সঃ
  • প্রকাশিত : ২৪ জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
জেনারেট ফটোকার্ড

ছবির ক্যাপশন:


লেখক: মোঃ মহিব উল্যাহ সোহেল
নির্বাহী সম্পাদক
সভ্যতার ইতিহাসে ক্ষমতা যেমন রাষ্ট্র নির্মাণ করেছে, তেমনি ক্ষমতার অপব্যবহারই বহু সভ্যতার পতনের কারণ হয়েছে। রাজনীতি মানুষের কল্যাণের জন্য জন্ম নিয়েছিল, কিন্তু ইতিহাসের অসংখ্য অধ্যায় সাক্ষ্য দেয়—যখন রাজনীতি নৈতিকতা হারায়, তখন তা জনসেবার শিল্প থেকে ক্ষমতা রক্ষার কৌশলে পরিণত হয়। আর তখন গণতন্ত্র কেবল একটি শব্দ হয়ে থাকে; তার আত্মা নিঃশেষিত হতে থাকে।

মানুষ রাষ্ট্র সৃষ্টি করেছে নিজের স্বাধীনতা, নিরাপত্তা এবং মর্যাদা রক্ষার জন্য। কিন্তু যখন রাষ্ট্রই মানুষের স্বাধীনতার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করে, তখন প্রশ্ন জাগে—রাষ্ট্র কাকে রক্ষা করছে? জনগণকে, নাকি ক্ষমতাকে?

গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল রাজনীতিকে সর্বোচ্চ মানবকল্যাণের বিজ্ঞান হিসেবে দেখেছিলেন। তাঁর মতে, রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য কেবল আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা নয়; বরং এমন একটি সমাজ গড়ে তোলা, যেখানে ন্যায়বিচার, নৈতিকতা এবং মানবিক মর্যাদা বিকশিত হবে। অন্যদিকে প্লেটো সতর্ক করেছিলেন—যখন শাসকের চরিত্রে নৈতিকতার অবক্ষয় ঘটে, তখন রাষ্ট্রের পতন অনিবার্য হয়ে ওঠে।

গণতন্ত্রের প্রকৃত সৌন্দর্য সংখ্যাগরিষ্ঠের ক্ষমতায় নয়; বরং সংখ্যালঘু ও ভিন্নমতের নিরাপত্তায়। যে রাষ্ট্র বিরোধী মতকে ভয় পায়, সে রাষ্ট্র নিজের শক্তির নয়, নিজের দুর্বলতার পরিচয় দেয়। কারণ সত্য কখনো সমালোচনাকে ভয় পায় না; ভয় পায় মিথ্যা, অন্যায় এবং অনৈতিক ক্ষমতা।

ক্ষমতা একটি অদ্ভুত নেশা। অর্থ, প্রতিপত্তি কিংবা খ্যাতির চেয়েও ক্ষমতার মোহ অধিক ভয়ংকর। কারণ ক্ষমতা মানুষকে এমন এক ভ্রমে আচ্ছন্ন করে, যেখানে সে নিজেকেই রাষ্ট্রের প্রতীক মনে করতে শুরু করে। তখন রাষ্ট্র, সরকার, দল এবং ব্যক্তির সীমারেখা ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যায়। এই অবস্থাই গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় সংকট।

ইংরেজ ইতিহাসবিদ লর্ড অ্যাকটনের বিখ্যাত উক্তি আজও সমান প্রাসঙ্গিক—"Power tends to corrupt, and absolute power corrupts absolutely." অর্থাৎ ক্ষমতা মানুষকে দুর্নীতিগ্রস্ত করে, আর সীমাহীন ক্ষমতা তাকে সম্পূর্ণভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত করে তোলে। এই বাস্তবতাই ইতিহাসের প্রতিটি স্বৈরাচারী শাসনের ভিত্তি।
গণতন্ত্রে বিরোধী দল কোনো শত্রু নয়; তারা রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় ভারসাম্য। বিরোধী কণ্ঠস্বর স্তব্ধ হয়ে গেলে সরকার নিজের ভুল দেখার আয়নাও হারিয়ে ফেলে। সমালোচনাহীন রাষ্ট্র ধীরে ধীরে আত্মপ্রবঞ্চনার শিকার হয়। সেখানে ন্যায়বিচারের পরিবর্তে আনুগত্য, যোগ্যতার পরিবর্তে দলীয় পরিচয় এবং আদর্শের পরিবর্তে ব্যক্তিপূজা স্থান দখল করে।

ক্ষমতা আঁকড়ে রাখার প্রবণতা সাধারণত তিনটি ভয় থেকে জন্ম নেয়। প্রথমত, ক্ষমতা হারানোর ভয়। দ্বিতীয়ত, জবাবদিহির ভয়। তৃতীয়ত, প্রতিশোধের ভয়। এই তিন ভয় যখন রাষ্ট্র পরিচালনার মূল চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে, তখন আইন আর ন্যায়বিচারের জন্য নয়; বরং ক্ষমতা সংরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত হতে শুরু করে। গণতন্ত্র তখন কেবল নির্বাচনের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকে, কিন্তু তার প্রাণশক্তি নিঃশেষ হয়ে যায়।
রাষ্ট্রের স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো—বিচার বিভাগ, নির্বাচন ব্যবস্থা, প্রশাসন, গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজ—গণতন্ত্রের স্তম্ভ। এসব প্রতিষ্ঠান যদি দলীয় প্রভাবের অধীনে চলে যায়, তাহলে রাষ্ট্রের কাঠামো অক্ষত থাকলেও তার আত্মা ধ্বংস হয়ে যায়। বাইরে গণতন্ত্রের অবয়ব থাকলেও ভেতরে জন্ম নেয় কর্তৃত্ববাদ।

দার্শনিকদের মতে, সভ্য রাষ্ট্রের শক্তি অস্ত্রে নয়, ন্যায়বিচারে। কারণ অস্ত্র ভয় সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু বিশ্বাস সৃষ্টি করতে পারে না। ভয় দিয়ে শাসন করা যায়, কিন্তু মানুষের হৃদয় জয় করা যায় না। জনগণের নীরবতা কখনোই শাসকের জনপ্রিয়তার প্রমাণ নয়; অনেক সময় সেটি ভয়, হতাশা অথবা বিকল্পহীনতার প্রকাশ।

একটি সুস্থ গণতন্ত্রে ক্ষমতার পরিবর্তন কোনো বিপর্যয় নয়; বরং সেটিই গণতন্ত্রের স্বাভাবিক সৌন্দর্য। যে রাষ্ট্রে ক্ষমতা শান্তিপূর্ণভাবে পরিবর্তিত হয়, সেই রাষ্ট্রই প্রকৃত অর্থে আত্মবিশ্বাসী। আর যে রাষ্ট্র ক্ষমতা হারানোর আশঙ্কায় বিরোধী কণ্ঠস্বর দমন করে, সে রাষ্ট্র নিজের ভিত্তির দুর্বলতাকেই প্রকাশ করে।

গণতন্ত্র কেবল একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা নয়; এটি একটি নৈতিক সংস্কৃতি। এখানে পরমতসহিষ্ণুতা, সংলাপ, যুক্তি, জবাবদিহি এবং আইনের শাসন একে অপরের পরিপূরক। যে সমাজে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শত্রু নয়, বরং ভিন্নমতের নাগরিক হিসেবে সম্মান করা হয়, সেখানেই গণতন্ত্র বিকশিত হয়।

আজ আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ক্ষমতার রাজনীতি নয়, দায়িত্বের রাজনীতি; প্রতিশোধের রাজনীতি নয়, সহনশীলতার রাজনীতি; ব্যক্তিপূজার রাজনীতি নয়, প্রতিষ্ঠানভিত্তিক রাজনীতি। কারণ ব্যক্তি ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু রাষ্ট্র চিরস্থায়ী। দল পরিবর্তিত হয়, কিন্তু জাতির ভবিষ্যৎ পরিবর্তিত হওয়া উচিত নয়।

ইতিহাসের আদালত কখনো ক্ষমতাবানদের দীর্ঘ সময় মনে রাখে না; মনে রাখে ন্যায়পরায়ণদের। সিংহাসনের আয়ু সীমিত, কিন্তু ন্যায়ের উত্তরাধিকার অনন্ত।

অতএব, বিরোধী মত দমন, ভয়ের সংস্কৃতি সৃষ্টি এবং যেকোনো মূল্যে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকা কখনোই গণতন্ত্রের ভাষা হতে পারে না। এগুলো গণতন্ত্রের মুখোশ পরে থাকা কর্তৃত্ববাদের লক্ষণ মাত্র। প্রকৃত গণতন্ত্রের ভিত্তি ক্ষমতা নয়, জনগণের আস্থা; শাসকের ইচ্ছা নয়, সংবিধানের শাসন; এবং দলীয় আধিপত্য নয়, ন্যায়, স্বাধীনতা ও মানবিক মর্যাদার অবিচল প্রতিষ্ঠা।

শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখে বন্দুক নয়, বিশ্বাস; ক্ষমতা নয়, ন্যায়; আর শাসকের ভয় নয়, জনগণের স্বাধীন সম্মতি। যে রাষ্ট্র এই সত্য উপলব্ধি করতে পারে, সেই রাষ্ট্রই ইতিহাসে মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকে।


ad728

আলোচিত শীর্ষ ১০ সংবাদ