আমাদের সমাজে এখন প্রতিদিনের চেনা দৃশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে খবরের কাগজের পাতায় কিংবা অনলাইন পোর্টালের স্ক্রিনে কোনো না কোনো শিশুর ওপর পাশবিক নির্যাতন, ধর্ষণ বা হত্যার রোমহর্ষক খবর। মাগুরা বা নরসিংদীর সাম্প্রতিক নৃশংসতা কেবল বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধের চিত্র নয়; বরং তা আমাদের সামগ্রিক সামাজিক পচন, নৈতিক অবক্ষয় এবং চরম আইনি শিথিলতার এক ভয়াবহ দলিল। ৩-৪ বছরের অবুঝ শিশু থেকে শুরু করে স্কুল-মাদ্রাসার কোমলমতি শিক্ষার্থীরা আজ ঘরে-বাইরে, চেনা-অচেনা সর্বমহলে এক চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। প্রশ্ন উঠেছে, আমরা আসলে কেমন সমাজে বাস করছি, যেখানে একটি শিশুর স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার ন্যূনতম অধিকারটুকুও আজ ভূলুণ্ঠিত?
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে যে চিত্রটি সামনে আসে, তা কেবল উদ্বেগজনক নয়, রীতিমতো আতঙ্কজনক। বিগত কয়েক বছরের তুলনায় বর্তমান সময়ে শিশু নির্যাতনের গ্রাফ যেভাবে জ্যামিতিক হারে ওপরের দিকে উঠছে, তা আমাদের বিবেককে প্রতিনিয়ত প্রশ্নবিদ্ধ করে। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, এই সমস্ত অপরাধের একটি বড় অংশই ঘটছে শিশুদের পরিচিত গণ্ডির মধ্যে—প্রতিবেশী, আত্মীয়, কিংবা শিক্ষকের ছদ্মবেশে থাকা কোনো নরপশুর দ্বারা। চকোলেট বা খাবারের লোভ দেখিয়ে যে অবুঝ শিশুদের ফাঁদে ফেলা হচ্ছে, তারা বোঝার আগেই তাদের শৈশবকে চিরতরে অন্ধকারের অতলে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।
এই নীরব মহামারির পেছনে সবচেয়ে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা। একটি ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র ক্ষোভের ঝড় ওঠে, প্রতিবাদ হয়, হয়তো আসামিও গ্রেপ্তার হয়; কিন্তু এর পরপরই দৃশ্যপট থেকে বিষয়টি হারিয়ে যায়। আইনের ফাঁকফোকর এবং প্রভাবশালী মহলের নানা তদবিরের কারণে মামলার তদন্ত ও চূড়ান্ত রায় হতে বছরের পর বছর লেগে যায়। এই দীর্ঘসূত্রতা একদিকে যেমন ভুক্তভোগী পরিবারকে মানসিকভাবে ধ্বংস করে দেয়, অন্যদিকে অপরাধীদের মনে এই বার্তা দেয় যে, অপরাধ করেও পার পাওয়া সম্ভব। এই বিচারহীনতাই অন্য সম্ভাব্য অপরাধীদের আরও বেশি দুঃসাহসী করে তুলছে।
সম্প্রতি ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) আইন, ২০২৬’ পাস করে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড এবং বিপুল পরিমাণ অর্থদণ্ডের বিধান করা হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। কিন্তু আমরা বিশ্বাস করি, শুধু কাগজের পাতায় কঠোর আইন বা সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রেখে এই সামাজিক ব্যাধি দূর করা সম্ভব নয়, যদি না তার দ্রুত ও কঠোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা যায়। অপরাধের পর নির্ধারিত ৯০ দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করে বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে যদি দ্রুততম সময়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি কার্যকর করা না যায়, তবে এই আইনের কার্যকারিতা ভেস্তে যাবে।
পাশাপাশি, আমাদের নজর দিতে হবে সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়ের দিকে। প্রযুক্তির অবাধ ও অনিয়ন্ত্রিত অপব্যবহার, পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতা যুবসমাজের একটি অংশকে বিকৃত মানসিকতার দিকে ধাবিত করছে। এর প্রতিকারে কেবল রাষ্ট্রীয় আইনই যথেষ্ট নয়; আমাদের পারিবারিক সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। সন্তানদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা, তাদের আচরণের দিকে নজর রাখা এবং ঘরে-বাইরে তাদের নিরাপত্তা নিয়ে অভিভাবকদের আরও বেশি সতর্ক হতে হবে।
আমরা আর কোনো বিপন্ন শৈশবের গল্প শুনতে চাই না। আমরা চাই না কোনো মায়ের কোল এভাবে খালি হোক কিংবা কোনো শিশুর সুন্দর ভবিষ্যৎ অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যাক। এই সামাজিক ব্যাধি থেকে মুক্তি পেতে হলে রাষ্ট্র, প্রশাসন, গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজকে একযোগে কাজ করতে হবে। অবিলম্বে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল সচল করে অপরাধীদের দ্রুততম সময়ে দৃশ্যমান ও কঠোরতম শাস্তি নিশ্চিত করা হোক—এটাই আজকের সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। অন্যথায়, আজ আমরা যে নীরবতা ও উদাসীনতা দেখাচ্ছি, তার চড়া মূল্য দিতে হবে আমাদের পুরো প্রজন্মকে।
আপনার মতামত লিখুন :