ঝিকরগাছা হানাদার মুক্ত দিবস আজ : স্মৃতিহীনতায় হারিয়ে যাচ্ছে ইতিহাসের গৌরবময় অধ্যায়
প্রতিদিনের কণ্ঠস্বর ডেক্সঃ
- প্রকাশিত : ০৫ ডিসেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ
জেনারেট ফটোকার্ড
ঝিকরগাছা হানাদার মুক্ত দিবস আজ : স্মৃতিহীনতায় হারিয়ে যাচ্ছে ইতিহাসের গৌরবময় অধ্যায়
____________________________
আজ ৬ ডিসেম্বর। যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার গর্বের দিন—হানাদার মুক্ত দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, ত্যাগ ও আত্মদান শেষে পাক হানাদার বাহিনীর কবলমুক্ত হয় ঝিকরগাছা। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পেরিয়ে গেলেও দিবসটি পালনে সরকারি বা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কোনো আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি না থাকায় স্থানীয়দের মনে ক্ষোভ ও হতাশা রয়ে গেছে।
হানাদার বাহিনীর বর্বরতার স্মৃতি
মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ঝিকরগাছা ছিল পাক বাহিনীর বর্বরতার অন্যতম লক্ষ্যবস্তু। গ্রামেগঞ্জে আগুন, লুটপাট, নির্যাতন, নারী নিপীড়ন—সবই ঘটেছে এই জনপদে। স্থানীয় শিক্ষার্থী, যুবসমাজ, কৃষক, শ্রমিক ও মুক্তিকামী সাধারণ মানুষ পাকিস্তানি উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।
যুদ্ধ চলাকালে যশোরের চৌগাছা উপজেলার সিংহঝুলি গ্রামের কৃতিসন্তান মশিয়ুর রহমানকে পাক হানাদার ও রাজাকার বাহিনী আটক করে। পরে তাঁর হাত-পা বেঁধে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই নির্মম হত্যাকাণ্ড এলাকাজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে এবং মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে নতুন করে প্রতিশোধের আগুন জ্বেলে দেয়।
পাক সেনাদের কৌশলগত অবস্থান
ঝিকরগাছা ও চৌগাছা উপজেলার সীমান্তবর্তী কাবিলপুর ও গোয়ালহাটি এলাকাকে পাক হানাদার বাহিনী কৌশলগত ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করত। সেখানে টহল, হামলা, ধ্বংসযজ্ঞ—সবই চালানো হতো শত্রুবাহিনীর নির্দেশে। অপরদিকে মুক্তিযোদ্ধারা বিভিন্ন গ্রামে গেরিলা কৌশলে প্রতিরোধ চালান, যার ফলে পাক বাহিনী ক্রমে দুর্বল হতে থাকে।
৫ ডিসেম্বরের উত্তাল রাত
১৯৭১ সালের ৫ ডিসেম্বর সন্ধ্যার পর পাক সেনারা ঝিকরগাছা বাজারের কপোতাক্ষ নদীর ওপর নির্মিত ব্রিজ দিয়ে পালানোর প্রস্তুতি নিতে থাকে। কিন্তু দেশপ্রেমে উজ্জীবিত মুক্তিকামী মানুষ খবর পেয়ে ব্রিজের দুই প্রান্তে অবস্থান নেন। সেদিন রাতের উত্তেজনা, গোলাগুলি, আর বীরত্বের গল্প আজো স্থানীয় প্রবীণরা স্মরণ করেন আবেগভরে।
মুক্তিযোদ্ধা ও স্থানীয় জনগণের প্রতিরোধের খবর পেয়ে পাক হানাদার বাহিনী রাতেই ঝিকরগাছা উপশহর ত্যাগ করে যশোর সেনানিবাসের দিকে পালিয়ে যায়। পালানোর পথে তারা বিভিন্ন স্থানে আগুন ও তাণ্ডব চালালেও মুক্তিকামী জনতার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা তাদের পথ আটকে দেয়।
৬ ডিসেম্বর: ঝিকরগাছার বিজয়ের দিন
পরদিন ৬ ডিসেম্বর সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে স্পষ্ট হয়—ঝিকরগাছা আর শত্রুর দখলে নেই। দীর্ঘ সংগ্রামের পর অবশেষে মুক্ত হয় উপজেলার প্রতিটি ইঞ্চি মাটি। বিজয়ের উল্লাসে ভরে ওঠে নদী-খাল-বিল, গ্রাম-শহর। স্বাধীনতার পতাকা উড়তে থাকে সর্বত্র।
ইতিহাস ভুলে যাচ্ছে প্রশাসন
স্থানীয় প্রবীণ মুক্তিযোদ্ধা ও সচেতন মহলের অভিযোগ—
“ঝিকরগাছা হানাদার মুক্ত দিবস স্থানীয় সংবাদকর্মীদের কলমে ইতিহাস হয়ে থাকলেও, সরকারি কোনো আয়োজনই দেখা যায় না। নতুন প্রজন্ম এই দিনের তাৎপর্য ঠিকভাবে জানতে পারে না।”
অনেকের মতে, স্মরণীয় এই দিনটির মর্যাদা রক্ষায় প্রতি বছর র্যালি, আলোচনাসভা, প্রদর্শনী, শহীদদের স্মরণে দোয়া ও গার্ড অব অনার দেওয়ার মতো কর্মসূচি থাকা প্রয়োজন ছিল।
স্মৃতি সংরক্ষণে প্রয়োজন উদ্যোগ
ইতিহাসবিদ, গবেষক ও স্থানীয় সংস্কৃতি কর্মীরা মনে করেন—
ঝিকরগাছা মুক্ত দিবসকে জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্ব দেওয়া
শহীদদের তালিকা সংরক্ষণ
স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন
স্কুল-কলেজে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক আলোচনা সভা
স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের সাক্ষাৎকার আর্কাইভে সংরক্ষণ
—এসবই সময়ের দাবি।
ঝিকরগাছা হানাদার মুক্ত দিবস শুধু একটি তারিখ নয়; এটি হাজারো মানুষের আত্মদান, বীরত্ব, দ্রোহ এবং স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। সময়ের আবর্তে স্মৃতিগুলো মুছে না যাওয়ার জন্য সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে দিবসটির মর্যাদা পুনরুদ্ধার জরুরি
ইনকিয়াদ আহম্মেদ রাফিন,
ঝিকরগাছা উপজেলা প্রতিনিধি
আপনার মতামত লিখুন :