১১ দিনের ব্যবধানে বাবা-ছেলের অস্বাভাবিক মৃত্যু: পরিবার কি যাবে আইনি পথে?


FavIcon
প্রতিদিনের কণ্ঠস্বর ডেক্সঃ
  • প্রকাশিত : ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
জেনারেট ফটোকার্ড

ছবির ক্যাপশন:

মোঃ মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী, মৌলভীবাজার

চিকিৎসক ছেলের মরদেহ জানালার গ্রিলে, আর ১১ দিন পর আইনজীবী বাবার মরদেহ নিজ বাসায়—মৌলভীবাজারের পরিচিত ও ঐতিহ্যবাহী ‘বট’ পরিবারের এই দুই মৃত্যুর কারণ নিয়ে এখন চারদিকে নানা প্রশ্ন। পরিবারটি কি শেষ পর্যন্ত আইনি পথে হাঁটবে?

​মাত্র ১১ দিনের ব্যবধানে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন বাবা ও একমাত্র ছেলে। পেশায় একজন ছিলেন চিকিৎসক, অন্যজন আইনজীবী। প্রথমজনের মরদেহ উদ্ধার হয়েছিল সিলেট নগরের একটি বাসা থেকে জানালার গ্রিলের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায়। আর দ্বিতীয়জনের মরদেহ পাওয়া যায় মৌলভীবাজার শহরের নিজ বাসায়, ভেতর থেকে বন্ধ দরজা খোলার পর।

​এমন কী ঘটেছিল এই পরিবারে? কেন এমন মর্মান্তিক পরিণতি হলো বাবা-ছেলের? দুই মৃত্যুর কারণ উদঘাটনে পরিবার কি আইনি লড়াইয়ে নামবে, নাকি ঘটনাগুলোকে স্বাভাবিক মৃত্যু হিসেবে মেনে নেবে—এই প্রশ্নগুলোই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে সবার মনে।

​ঘটনার শুরু যেভাবে

​গত ৭ সেপ্টেম্বর সিলেটের মির্জাজাঙ্গাল এলাকার একটি ভাড়া বাসা থেকে উদ্ধার করা হয় ডা. পদ্মজিৎ চক্রবর্তী প্রান্তের (৩১) মরদেহ। ব্রাহ্মণবাড়িয়া মেডিকেল কলেজের এই চিকিৎসককে জানালার গ্রিলের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায় বলে জানায় পুলিশ। প্রাথমিকভাবে আত্মহত্যার ধারণা করা হলেও, মৃত্যুর আসল কারণ নিশ্চিত হতে ময়নাতদন্ত ও পুলিশের তদন্ত রিপোর্টের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

​এর ঠিক ১১ দিন পর, গত ১৮ সেপ্টেম্বর সকালে মৌলভীবাজার শহরের এম সাইফুর রহমান সড়কের ‘ভটের ফার্মেসি’র দ্বিতীয় তলার বাসা থেকে উদ্ধার করা হয় তাঁর বাবা আইনজীবী পূর্ণেন্দ্র চক্রবর্তীর মরদেহ। পেশায় আইনজীবী পূর্ণেন্দ্রের বাসার দরজা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। পুলিশ দরজা ভেঙে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে। তবে তাঁর মরদেহ ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়ার কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। পুলিশের ধারণা, একমাত্র ছেলের মৃত্যুর পর থেকেই তিনি মানসিকভাবে মারাত্মক বিপর্যস্ত ছিলেন।

​১১ দিনের ব্যবধান: কেবলই কাকতাল, নাকি গভীর কোনো রহস্য?

​একটি মৃত্যুর রেশ কাটতে না কাটতেই আরেকটি মৃত্যু। প্রথম ঘটনা সিলেটে, দ্বিতীয়টি মৌলভীবাজারে। মৃত্যুর পরিস্থিতিও এক নয়। তবুও সময়ের এই অস্বাভাবিক নৈকট্য তদন্তের বিষয়গুলোকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। সামনে এসেছে বেশ কিছু অমীমাংসিত প্রশ্ন:

  • যোগাযোগ ও গতিবিধি: মৃত্যুর আগে ডা. প্রান্তের গতিবিধি কেমন ছিল? কার কার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ হয়েছিল? তাঁর মোবাইল ও ডিজিটাল ডিভাইসে কী তথ্য রয়েছে?
  • পিতার শেষ সময়: ছেলের মৃত্যুর পরের ১১ দিনে আইনজীবী পূর্ণেন্দ্র চক্রবর্তীর সঙ্গে কারা যোগাযোগ করেছিলেন? তাঁর শেষ সময়ের গতিবিধিই বা কী ছিল?
  • ঘটনার যোগসূত্র: প্রথম মৃত্যুর তদন্তে পাওয়া কোনো তথ্য কি দ্বিতীয় মৃত্যুর ঘটনাকে বোঝার ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে?

​পরিবারের অবস্থান ও আইনি পদক্ষেপের প্রশ্ন

​মৌলভীবাজারের পরিচিত এই ঐতিহ্যবাহী পরিবারের বাবা ও একমাত্র ছেলের পরপর এমন মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে এবং চলছে নানা আলোচনা। তবে এখন পর্যন্ত পরিবারের পক্ষ থেকে দুই মৃত্যুর বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ, সন্দেহ বা আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কথা প্রকাশ্যে আসেনি।

​এখানেই বড় প্রশ্ন—

  • ​পরিবার কি দুই মৃত্যুর পূর্ণাঙ্গ তদন্ত দাবি করবে?
  • ​প্রয়োজনে কি তারা আইনগত পদক্ষেপ নেবে?
  • ​নাকি শুধু ময়নাতদন্ত ও পুলিশের তদন্তের ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করবে?

​গুঞ্জন বনাম বাস্তব প্রমাণ

​দুই মৃত্যুর পর স্থানীয় পর্যায়ে পারিবারিক অশান্তি, দাম্পত্য সমস্যা বা অভ্যন্তরীণ কলহ নিয়ে নানা গুঞ্জন শোনা গেলেও—আলোচনা, গুঞ্জন আর বাস্তব প্রমাণ এক নয়। কোনো ঘটনাকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য তথ্য। এজন্য মৃতদের সাম্প্রতিক যোগাযোগ, পারিবারিক সম্পর্ক, আর্থিক ও পেশাগত পরিস্থিতি, মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড এবং শেষ মুহূর্তের গতিবিধি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখা জরুরি।

​গুঞ্জন নয়, প্রয়োজন পূর্ণাঙ্গ তদন্ত

​ডা. প্রান্ত এবং তাঁর বাবা অ্যাডভোকেট পূর্ণেন্দ্র চক্রবর্তীর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এখনো কুয়াশাচ্ছন্ন। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন, ঘটনাস্থলের আলামত, ফরেনসিক পরীক্ষা, ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করেই কেবল সত্যে পৌঁছানো সম্ভব।

​একটি পরিবারের জন্য ১১ দিনের ব্যবধানে একমাত্র সন্তান ও বাবাকে হারানোর এই শোকে স্তব্ধ পুরো এলাকা। এটি কেবল দুটি মৃত্যুর পরিসংখ্যান নয়, বরং একটি পরিবারের অপূরণীয় ট্র্যাজেডি। ঐতিহ্যবাহী এই বট পরিবারে আসলে কী ঘটেছিল? দুই মৃত্যুর কোনো যোগসূত্র আছে কি না—তার উত্তর মিলবে একমাত্র নিরপেক্ষ ও গভীরে গিয়ে করা পুলিশের তদন্তেই।


ad728

আলোচিত শীর্ষ ১০ সংবাদ