মৌলভীবাজারে ফল ব্যবসায়ী রহিমের উপর পূর্ব বিরোধে হামলা নাকি মিথ্যা মামলা? - পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে


FavIcon
প্রতিদিনের কণ্ঠস্বর ডেক্সঃ
  • প্রকাশিত : ১৯ জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
জেনারেট ফটোকার্ড

ছবির ক্যাপশন:

ছবি ঘটনাস্থলের 

মোঃ মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী, বিশেষ প্রতিনিধি :

মৌলভীবাজার সদর উপজেলার চুবড়া এলাকায় ফল ব্যবসায়ী আব্দুর রহিমকে কুপিয়ে গুরুতর জখম ও নগদ এক লাখ টাকা ছিনতাইয়ের অভিযোগে ৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। তবে অভিযুক্তরা অভিযোগ অস্বীকার করে ঘটনাটিকে পূর্ব শত্রুতার জেরে দায়ের করা "মিথ্যা ও বানোয়াট মামলা" বলে দাবি করেছেন। এদিকে স্থানীয়দের অধিকাংশই হামলার ঘটনা প্রত্যক্ষ না করলেও এলাকায় পূর্ব বিরোধের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত ২ জুন ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ রাত আনুমানিক সাড়ে ৮টার দিকে চুবড়া এলাকার একটি ফলের দোকানের সামনে মোটরসাইকেল রাখা নিয়ে কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে সংঘবদ্ধ হামলার ঘটনা ঘটে। অভিযোগ অনুযায়ী, দেশীয় অস্ত্র ও লোহার রড দিয়ে ফল ব্যবসায়ী আব্দুর রহিমের ওপর হামলা চালানো হয়। এতে তিনি গুরুতর আহত হন এবং তার কাছে থাকা ফল ব্যবসার নগদ প্রায় এক লাখ টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয়।

স্থানীয়রা এগিয়ে এলে হামলাকারীরা ঘটনাস্থল ত্যাগ করে বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।

গুরুতর আহত অবস্থায় আব্দুর রহিমকে প্রথমে মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে তাকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়। বর্তমানে তিনি চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

এ ঘটনায় আহতের স্ত্রী রাশেদা বেগম বাদী হয়ে মৌলভীবাজার সদর মডেল থানায় ৬ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন। আসামিরা হলেন সেলিম মিয়া, শহিদ মিয়া, জাবেদ আহমদ, মাছুম আহমদ, ইমন আহমদ ও মোবারক আলীর বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ১৪৩/৩২৩/৩২৬/৩০৭/৩৭৯/৫০৬(২) ধারায় গত ৩জুন মামলা রুজু করা হয়েছে।

ঘটনাস্থল সরেজমিনে গিয়ে স্থানীয় ব্যবসায়ী কামাল এন্ড ব্রাদার্সের স্বত্বাধিকারী মোঃ আফজল হোসেনের সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, “রাত প্রায় ৯টার পর যখন মারামারি হয় তখন বিদ্যুৎ ছিল না। কলা ব্যবসায়ী আব্দুর রহিমকে কারা মারধর করেছে আমি দেখিনি। অন্ধকারে শুধু মারামারি হয়েছে, তবে কে বা কারা জড়িত ছিল তা জানি না।”

ঘটনাস্থলের অদূরে চায়ের দোকান পরিচালনাকারী সালাহউদ্দিন মিয়ার সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, “যখন মারামারি হয় তখন বৃষ্টি হচ্ছিল, বিদ্যুৎও ছিল না। হঠাৎ দৌড়াদৌড়ি করতে দেখি। কারা দৌড়াদৌড়ি করেছে চিনতে পারিনি। শুনেছি আব্দুর রহিমকে সেলিম মেরেছে, তবে কেউ দেখেনি, আমিও দেখিনি। সবাই শুনেছে।”

মোবারক আলী ও শহিদ মিয়ার দোকান খোলা ছিল কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, “তখন তাদের দোকান খোলা ছিল।”

এলাকার বাসিন্দা কামরুল মিয়া বলেন, “শুনেছি মারামারি হয়েছে, তবে কে বা কারা মারামারি করেছে আমি দেখিনি।”

মামলার বাদী ও আহতের স্ত্রী রাশেদা বেগম বলেন, “ঘটনার আগে আমরা হবিগঞ্জে ছিলাম। আমার স্বামী ব্যবসার আড়তদারকে টাকা দেওয়ার জন্য এক লাখ টাকা নিয়ে চুবড়া এলাকায় আসেন। দোকান থেকে টাকা পাঠানোর জন্য গেলে পূর্বপরিকল্পিতভাবে তাকে কুপিয়ে আহত করা হয় এবং তার লুঙ্গির মোড়ে রাখা এক লাখ টাকা নিয়ে যায়।”

আহতের ভাই আলিম জানান, এর আগে অভিযুক্তদের সঙ্গে দোকানে একটি মারামারির ঘটনা ঘটে, যেখানে সেলিম মিয়া আহত হন।

তিনি বলেন, “পরে সাবেক কমিশনার বায়েছ আহমদের উপস্থিতিতে শালিস বৈঠক হয়। সেখানে আমার ভাই আব্দুর রহিমকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছিল।”

তিনি আরও বলেন,

“২ জুন রাতের ঘটনার খবর পেয়ে গিয়ে দেখি আমার ভাই রাস্তায় পড়ে আছে। পরে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাই।”

স্থানীয় বাসিন্দা দরবেশ মিয়া বলেন, “আব্দুর রহিম আমার গ্রাম সম্পর্কের ভাগ্না হয়। চিৎকার শুনে গিয়ে দেখি সে আহত অবস্থায় পড়ে আছে। তবে মারামারির সময় আমি উপস্থিত ছিলাম না, তাই কে বা কারা মেরেছে দেখিনি।”

মোঃ সামছু মিয়া জানান, “যখন মারামারি হয় তখন বৃষ্টি হচ্ছিল। আমি শ্রীমঙ্গল রোডে ছিলাম। পরে চুবড়া রোডে এসে দেখি লন্ডনীর মার্কেটের সামনে আব্দুর রহিম রাস্তায় পড়ে আছে। বৃষ্টির পানি ও রক্তে ভেসে যাচ্ছিল। পরে তাকে গাড়িতে তুলে হাসপাতালে পাঠানো হয়।”

তিনি আরও বলেন, “আমি শুনেছি সেলিম ও তার ভাইয়েরা মেরেছে, তবে আমি নিজে দেখিনি।”

অভিযুক্ত মোবারক আলী অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “আব্দুর রহিমকে আমরা মারিনি। এর আগে আমার ছেলে সেলিমকে মারধর করা হয়েছিল। বিষয়টি শালিসের মাধ্যমে মীমাংসা হয়েছিল। আমাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট।”

তিনি পূর্ব বিরোধের বর্ণনা দিয়ে বলেন, তার ছেলে শহিদের চায়ের দোকান ও তার ভুষিমালের দোকানকে কেন্দ্র করে আব্দুর রহিমের সঙ্গে কয়েক দফা কথা কাটাকাটি হয়। এক পর্যায়ে সেলিম ও আব্দুর রহিমের মধ্যে সংঘর্ষে সেলিম আহত হন। পরে স্থানীয়ভাবে সাবেক কমিশনার বায়েছ আহমদের উপস্থিতিতে শালিস বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় এবং সেখানে আব্দুর রহিমকে জরিমানা করা হয়। বিষয়টি তখন মীমাংসা হয়ে যায় বলে তিনি দাবি করেন।

মোবারক আলী আরও বলেন,

“২ জুন রাতে আমি আমার দোকানে বসা ছিলাম। তখন বৃষ্টি হচ্ছিল এবং এলাকায় বিদ্যুৎ ছিল না। আমার ছেলে কলোনির দিকে গিয়েছিল। পরে শুনতে পাই লন্ডনীর মার্কেটের সামনে আব্দুর রহিমকে কে বা কারা মারধর করেছে। কিন্তু আমি ঘটনাস্থলে ছিলাম না এবং কে বা কারা হামলা করেছে তা জানি না। এরপর দেখি আমার ছেলে, নাতি ও পরিবারের সদস্যদের আসামি করে মামলা করা হয়েছে। আমরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই আমি, আমার ছেলে ও পরিবারের সদস্যরা আদালতে হাজির হয়ে জামিন নিয়েছি।”

তিনি আরও বলেন,

“আমার বড় ছেলে শহিদ মিয়ার শ্বশুর অসুস্থ থাকায় শহিদ মিয়া ও সেলিম মিয়া বর্তমানে তার চিকিৎসা ও দেখাশোনা নিয়ে ব্যস্ত রয়েছে। এ কারণে তারা এখনো আদালতে হাজির হতে পারেনি। তিনি সুস্থ হয়ে উঠলেই তারা আদালতে উপস্থিত হবে। আমরা আদালতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং বিশ্বাস করি তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হবে এবং আমরা ন্যায়বিচার পাব।”

মামলার আসামি মাছুম আহমদ বলেন, “যেদিন ঘটনা ঘটে সেদিন আমি কোচিং সেন্টারে ছিলাম। আমি মৌলভীবাজার টাউন কামিল মাদ্রাসার ছাত্র। রাত ৮টায় কোচিং শেষ হওয়ার পর বন্ধুদের সঙ্গে চৌমুহনায় প্রায় দুই ঘণ্টা ছিলাম। পরে বাসায় এসে শুনি এলাকায় মারামারি হয়েছে। পরদিন জানতে পারি আমাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। আমরা আদালতে হাজির হয়ে জামিন পেয়েছি। আমরা এ মিথ্যা ও বানোয়াট মামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই।”

অভিযুক্ত জাবেদ আহমদ বলেন, “আমি একজন ক্রিকেটার এবং মৌলভীবাজার দলের হয়ে খেলি। ঘটনার দিনও মাঠে খেলাধুলা করছিলাম। রাতে এলাকায় এসে মারামারির খবর শুনি। পরে জানতে পারি আমার বিরুদ্ধেও মামলা হয়েছে। আমরা আদালতে হাজির হয়ে জামিন পেয়েছি। এই ঘটনা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট।”

অভিযুক্ত ইমন আহমদ বলেন, “ঘটনার সময় বৃষ্টির কারণে আমি বাড়িতেই ছিলাম। পরে শুনেছি আব্দুর রহিমকে কে বা কারা মেরেছে। অথচ আমাকেও মামলার আসামি করা হয়েছে। আমি এই মিথ্যা মামলা থেকে পরিত্রাণ চাই।”

চুবড়া কলোনির ভাড়াটিয়া আনোয়ারা বেগম (মনাইর মা) বলেন,

“সেলিম আমার ঘরে বুয়াত আছিল। আমি, রুবেল আর সেলিম তিনজন চা খানিত আসলাম। ওই সময় মেঘ আছিল। তখন মনে হয় ১০টা বাজে। এরপরে সেলিমের মোবাইলে কল আইছে, হে গেছেগি রাস্তা বায়।”

তিনি আরও বলেন,

“ই সময় মারামারির খবর শুনিয়া বার হইছি। তখনও শহিদ মিয়াও তার দোকানে আছিল। আরও কয়েকজন কইছে, তার বাবা মোবারক আলীও দোকানে আছিল। আমরা মিথ্যা কথা কেন বলমু? এরা কেউই আমাদের আত্মীয়-স্বজন না। সত্য কইয়া মরাও ভালো।”

মারামারির শিকার আব্দুর রহিমের বাসায় গিয়ে তার বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলে তাকে অসুস্থ ও পায়ে ব্যান্ডেজ বাঁধা অবস্থায় দেখা যায়। শারীরিক অবস্থার কারণে তিনি কথা বলতে সক্ষম ছিলেন না। ফলে তার সরাসরি বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

সরজমিনে ঘটনাস্থল ও এলাকার বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে আব্দুর রহিমের উপর হামলার প্রত্যক্ষ কোন সাক্ষী পাওয়া যাচ্ছে না। 

উক্ত বিষয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই তপন কুমার দাসের যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, ঘটনার পর থেকে উক্ত ঘটনার বিষয়ে তদন্ত চলছে। ঘটনার রহস্য উদঘাটনের জন্য সর্বোচ্চ চলছে। মামলায় ৬জন আসামীর মধ্যে ৪জনকে আদালত জামিন দিয়েছেন। 

এজহারে থাকা সাক্ষীদের একাধিক বার যোগাযোগ করেও তাদের সাক্ষ্য পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই তপন কুমার দাস। 

তিনি আরো বলেন উক্ত ঘটনার প্রমাণ ও প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তদন্ত শেষে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করা হবে।


ছবি সংযুক্ত


ad728

আলোচিত শীর্ষ ১০ সংবাদ