জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের অবদান চীর অম্লান —সারোয়ার ওয়াদুদ চৌধুরী।


FavIcon
প্রতিদিনের কণ্ঠস্বর ডেক্সঃ
  • প্রকাশিত : ০২ নভেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
জেনারেট ফটোকার্ড

ছবির ক্যাপশন:



নিজস্ব প্রতিবেদন:
জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান, সৎ সাহসী, নির্ভীক, নির্মোহ, নিঃস্বার্থ, নিবেদিত দেশপ্রেমিক ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের ১৪০তম জন্মবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি জ্ঞাপন করছি। 

শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বাংলাদেশের ইতিহাসে একজন কিংবদন্তিতুল্য নিবেদিত প্রাণ রাজনীতিবিদ ও জনদরদী জনপ্রতিনিধি।

বাংলা ভাষার জন্য তাঁর ঐতিহাসিক ভূমিকা জাতি চিরদিন স্মরণ করবে। 

শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের জন্ম ১৮৮৬ সালের ২রা নভেম্বর তৎকালীন বাংলা প্রদেশের ত্রিপুরা জেলার অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার রামরাইল গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত কায়স্থ পরিবারে। উনার বাবা জগবন্ধু দত্ত ছিলেন কসবা ও নবীনগর মুন্সেফ আদালতের সেরেস্তাদার। তাঁর মাতা ছিলেন কুমিল্লার চাপিতলা গ্রামের রক্ষিত পরিবারের কন্যা। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ১৯০৪ সালে নবীনগর হাই স্কুল হতে প্রবেশিকা, ১৯০৬ সালে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে এফ.এ. পাস করেন এবং ১৯০৮ সালে কোলকাতা রিপন কলেজ থেকে বি.এ এবং ১৯১০ সালে একই কলেজ হতে বি.এল পরীক্ষায় পাস করেন। কোলকাতার রিপন কলেজের ছাত্র থাকা অবস্থায় ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত মুরাদনগর থানার পূর্বধইর গ্রামের আইনজীবী কৃষ্ণকমল দাসমুন্সীর কন্যা সুরবালা দাসকে বিয়ে করেন। উনাদের সংসারে সাত মেয়ে ও দুই ছেলে জন্মগ্রহণ করে। দীর্ঘ ৪৩ বছর দাম্পত্য জীবনের অবসান ঘটে ১২ আগস্ট ১৯৪৯ সালে স্ত্রী সুরবালার মৃত্যুর মাধ্যমে।

তিনি ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে যোগ দেন। ১৯১৯ সালে ময়মনসিংহ শহরে অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের সম্মেলনে তিনি অংশগ্রহণ করেন। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের আহ্বানে তিনি তিন মাসের জন্য আইন ব্যবসা স্থগিত রাখেন এবং অসহযোগ আন্দোলনে অংশ নেন। 

১৯৩৭ সালে তিনি বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার সদস্য নির্বাচিত হন। বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন সংশোধন, বঙ্গীয় কৃষিঋণ গ্রহীতা ও বঙ্গীয় মহাজনি আইন পাসের সাথে ধীরেন দত্ত সংশ্লিষ্ট ছিলেন। 

তিনি ১৯৪২ সালে “ভারত ছাড়” ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের জন্য বেশ কয়েকবার গ্রেফতার হয়ে বিভিন্ন কারাগারে বিনাশ্রম ও সশ্রম দণ্ড ভোগ করেন।

১৯৪৬ সালের নির্বাচনে তিনি কংগ্রেস দলের টিকিটে বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার সদস্য নির্বাচিত হন। পাকিস্তানের সংবিধান রচনার জন্য ঐ বছর ডিসেম্বরে পূর্ববঙ্গ হতে তিনি পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। 

১৯৪৭ সালের পর একজন অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিক হিসেবে পাকিস্তানের রাজনীতিতে সক্রিয় অংশ গ্রহণ করেন। ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে দেশভাগের পর নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানে ভাষা আন্দোলনের প্রথম ভাষা সৈনিক ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। সেইদিন ছিল ১৯৪৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি, বলা যেতে পারে, পাকিস্তানে ভাষা আন্দোলনের আনুষ্ঠানিক সূত্রপাত। অধিবেশনের শুরুতে আলোচনার সূত্রপাত করে তৎকালীন সংসদ সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত পাকিস্তানের করাচীতে পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে বলেনঃ "Mr. President, Sir, I move: “That in sub-rule (1) of rule 29, after the word ‘English’ in line 2, the words ‘or Bengalee’ be inserted.” এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি বাংলা ভাষা সংক্রান্ত আলোচনা পার্লামেন্টে প্রথম উত্থাপন করেন। 

তিনি বলেছিলেন বাংলা একটি প্রাদেশিক ভাষা হলেও সমগ্র পাকিস্তানের মোট ৬ কোটি ৯০ লক্ষ লোকের মধ্যে ৪ কোটি ৪০ লক্ষ লোক বাংলা ভাষায় কথা বলে, অর্থাৎ সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠি বাঙালি। অথচ ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে পাকিস্তান সরকার যে ভূমিকা পালন করেছে তা মোটেই সমর্থনযোগ্য নয়। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত প্রমাণ দিয়ে দেখিয়েছেন, পোস্ট অফিসের মাধ্যমে টাকা পাঠাতে গেলে যে ফর্ম পূরণ করতে হয় সেটি মুদ্রিত উর্দু ভাষায়; খাম-পোস্টকার্ডের উপরে ছাপানো ভাষা উর্দু; জমি বেচাকেনার জন্যে ভেন্ডার-এর কাছ থেকে যে স্ট্যাম্প কিনতে হয়, সেটাও উর্দু ভাষায়। সেইদিন আবেগতাড়িত কণ্ঠে শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত জনসংখ্যার অনুপাতে বাংলার স্বপক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করতে গিয়ে একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উপস্থাপন করেন; যেটি পরবর্তীকালে সমগ্র বাংলা ভাষাভাষীর প্রাণের দাবীতে পরিণত হয়। যেহেতু তৎকালীন পাকিস্তানের ৬ কোটি ৯০ লক্ষ জনসংখ্যার মধ্যে ৪ কোটি ৪০ লক্ষই বাঙালি, সেজন্যে তাঁর পাকিস্তান পার্লামেন্টে যুক্তিসঙ্গত প্রশ্ন ছিল, " Sir, what should be the State Language of the State? The State Language of the Sate should be the Language which is used by the majority of the people of the State."
শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত সেইদিন দ্ব্যর্থহীন ভাষায় আরো বলেন, “So, Sir, I know I am voicing the sentiments of the vast millions of our State and therefore Bengalee should not be treated as a Provincial Language. It should be treated as the language of the State. সময় এবং সঠিক সময়ই প্রকৃত সত্য উদঘাটন করে। শেষ বাক্য "It should be treated as the language of the state"-ই সর্বপ্রথম ঘোষণা দেয় রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই। সেই দাবী তুঙ্গে ওঠে ঠিক চার বছর পর; ২১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২ সালে। 

এরই ফলশ্রুতিতে, ১৯৫৬ সালে তথাকথিত ইসলামিক রিপাবলিক অব পাকিস্তানের শাসনতন্ত্রে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। বাঙালি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে পেলেও এই দাবি পাকিস্তানের পার্লামেন্টে উত্থাপনের জন্য চরম মূল্যে দিতে হয়েছিল শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে।

পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারির পর ১৯৬০ সালে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের উপর ‘এবডো’প্রয়োগ করা হয়। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় তাঁকে গৃহবন্দি করে, এতদসত্ত্বেও বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত গুরুত্বপূর্ণ বাঙালি নেতৃবৃন্দের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক বজায় রাখতেন।

ভাষা আন্দোলনের পথিকৃৎ শুধু ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনেই নয়, বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের। ১৯৭১ সালের ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনের পর তিনি কুমিল্লায় নিজের বাড়িতেও বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। স্বাধীনতার পক্ষে তার এই অবস্থান পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রোশের কারণ হয়ে ওঠে।

একাত্তরের ২৯ মার্চ রাত দেড়টায় কুমিল্লা শহরের ধর্মসাগর পাড়ের (শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত সড়ক) বাড়ি থেকে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত এবং উনার ছোট ছেলে দিলীপ দত্তকে ধরে নিয়ে যায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন বোখারি। এ সময় দিলীপ দত্তের পায়ে গুলি করা হয়েছিল। একটি জিপ, পাঁচটি ট্রাক ও একটি অ্যাম্বুল্যান্স এসে তাঁদের ধরে কুমিল্লা সেনানিবাসে নিয়ে যায়। কুমিল্লার কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী এডভোকেট আবদুল করিমের তত্ত্বাবধানে এই আটক অভিযান পরিচালনা হয়। 

হত্যার আগে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে শরীর ক্ষতবিক্ষত করে আয়োডিন লাগিয়ে এবং কারেন্টের শক দিয়ে টানা কয়েকদিন অমানবিক অত্যাচার করে বৃদ্ধ শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত এবং তাঁর পুত্র দিলীপ দত্তকে নিষ্ঠুর-নির্মম ভাবে হত্যা করা হয়। 

 পিতাপুত্রের শবদেহের সন্ধান আর মেলে নি!!

এই মহৎপ্রাণ গুণী মানুটির স্মরণে হীনমন্যতা উচিত নয়।

লেখকঃ সারোয়ার ওয়াদুদ চৌধুরী। গবেষক, লেখক ও সমাজকর্মী


ad728

আলোচিত শীর্ষ ১০ সংবাদ