ফাঁড়ি থেকেই চাঁদাবাজ উধাও! এস আই মাশুকের ‘রহস্যজনক’ ভূমিকা, নেপথ্যে গডফাদার মুহিত


FavIcon
প্রতিদিনের কণ্ঠস্বর ডেক্সঃ
  • প্রকাশিত : ২১ মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
জেনারেট ফটোকার্ড

ছবির ক্যাপশন:


অনুসন্ধানী প্রতিবেদন,
রমিজ উদ্দিন,চট্টগ্রাম: 

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নাকের ডগায় বসে প্রকাশ্য দিবালোকে চাঁদাবাজি, অতঃপর সাংবাদিকদের সাহসিকতায় গডফাদারসহ অপরাধী হাতেনাতে আটক। কিন্তু গল্পের সবচেয়ে নির্মম টুইস্টটি ঘটলো খোদ পুলিশ ফাঁড়ির ভেতরে। যেখানে পুলিশ রেগুলেশনের (PRB) সমস্ত নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, হাজতখানায় না পুরে জামাই আদরে বসিয়ে রাখা হলো দুর্ধর্ষ চাঁদাবাজকে। আর গভীর রাতে ‘টয়লেটের বাহানায়’ ফাঁড়ির ইনচার্জ (আইসি) মাকসুদের প্রত্যক্ষ হেফাজত থেকেই সুকৌশলে চম্পট দিল সেই আসামি!

গত রবিবার (১৭ মে) আনুমানিক রাত সাড়ে ১০টার দিকে চট্টগ্রামের হাটহাজারী থানাধীন মদুনাঘাট পুলিশ ফাঁড়ি সংলগ্ন রাউজান রোড নোয়াপাড়া এলাকায় ঘটে যাওয়া এই নজিরবিহীন ঘটনাটি এখন টক অব দ্য কান্ট্রি। অপরাধীকে এভাবে ‘নিরাপদ এক্সিট’ দেওয়ার ঘটনায় মদুনাঘাট ফাঁড়ির ইনচার্জ মাকসুদের পেশাদারিত্ব, সততা এবং পুলিশের অভ্যন্তরীণ প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি এখন চরম কাঠগড়ায়। মাঝরাতে ক্যামেরায় বন্দি চাঁদাবাজ: মহাসড়কে প্রকাশ্য জুলুম
অনুসন্ধানে জানা যায়, রাউজান নোয়াপাড়া ও মদুনাঘাট মহাসড়ককে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট। সাধারণ ব্যবসায়ী ও গাছভর্তি ট্রাক থামিয়ে নিয়মিত চলতো অবৈধ টোল আদায়। গত রবিবার রাতে মদুনাঘাট পুলিশ ফাঁড়ির ঠিক ঢিল ছোড়া দূরত্বে দাঁড়িয়ে প্রতিটি গাড়ি থেকে নগদ ২০০ টাকা থেকে শুরু করে ১,০০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা তুলছিল হাসান নামের এক লাইনম্যান।

গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ‘আমাদের অনুসন্ধানী টিম’ ঘটনাস্থলে ওত পেতে থাকে। ক্যামেরা সচল হতেই বন্দি হয় টাকা লেনদেনের অকাট্য ভিডিও ফুটেজ। সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে হাসান পালানোর চেষ্টা করলে এলাকাবাসী ও সাংবাদিকরা ধাওয়া করে তাকে হাতেনাতে ধরে ফেলে।

ফাঁড়ির ‘মাসোহারা’ ও তথাকথিত ‘বড় ভাই’ মুহিতের তেলেসমাতি আটকের পর হাসানকে মদুনাঘাট পুলিশ ফাঁড়িতে সোপর্দ করা হয়। সেখানে সাংবাদিকদের ক্যামেরা ও তীক্ষ্ণ জেরার মুখে ভেঙে পড়ে হাসান। অকপটে স্বীকার করে, এই সিন্ডিকেটের মূল হোতা স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নামধারী গডফাদার মুহিত, যাকে সে ‘বড় ভাই’ বলে সম্বোধন করে।

স্থানীয় ভুক্তভোগী চালকদের বিস্ফোরক অভিযোগ—এই চাঁদাবাজির টাকার একটি নির্দিষ্ট সিংহভাগ নিয়মিত ‘মাসোহারা’ হিসেবে পৌঁছাত খোদ মদুনাঘাট পুলিশ ফাঁড়ির অসাধু কর্মকর্তাদের পকেটে। আর এই খাতিরেই ফাঁড়ির একদম কাছে দাঁড়িয়ে এমন প্রকাশ্য জুলুমের লাইসেন্স পেয়েছিল এই চক্র।

ঘটনা বেগতিক দেখে সিন্ডিকেট প্রধান মুহিত সরাসরি মোবাইল ফোনে সকল সাংবাদিকদের কে ম্যানেজ করার জন্য মরিয়া চেষ্টা চালায়। নিউজ ধামাচাপা দেওয়ার শর্তে সাংবাদিকদের মোটা অঙ্কের টাকার (ঘুষ) টোপ দেওয়া হয়। কিন্তু সৎ ও আপসহীন সাংবাদিকরা এই অনৈতিক প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে মুহিতকে সরাসরি ফাঁড়িতে এসে মুখোমুখি হওয়ার চ্যালেঞ্জ জানালে সে ফোন বন্ধ করে আত্মগোপনে চলে যায়।

হাজতখানা বাদ দিয়ে খাতির: আইসি মাকসুদের হেফাজত থেকে ‘পরিকল্পিত’ চম্পট!

এই কলঙ্কজনক অধ্যায়ের সবচেয়ে রহস্যজনক ও সন্দেহজনক ঘটনাটি ঘটে ফাঁড়ির ভেতরে। হাতেনাতে ধৃত একজন চিহ্নিত চাঁদাবাজকে যেখানে অবিলম্বে লকআপে ঢোকানোর কথা, সেখানে তাকে সাধারণ কক্ষে বসিয়ে রাখা হয়। ঘটনার সময় ফাঁড়ির পূর্ণ দায়িত্বে এবং সশরীরে উপস্থিত ছিলেন ইনচার্জ মাকসুদ নিজেই।
গভীর রাতে হাসান ‘প্রকৃতির ডাকে’ সাড়া দেওয়ার নাটক করলে তাকে টয়লেটে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। নিয়ম অনুযায়ী, একজন আসামির হাতে হ্যান্ডকাফ এবং সাথে সার্বক্ষণিক সেন্ট্রি (পাহারা) থাকার বাধ্যবাধকতা থাকলেও, হাসানকে সম্পূর্ণ ‘মুক্ত’ অবস্থায় চোখের আড়াল হওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। আর এই সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া না করে আইসি মাকসুদের হেফাজত থেকেই সুকৌশলে ফাঁড়ি থেকে হাওয়া হয়ে যায় চাঁদাবাজ হাসান।

রক্ষকই যখন ভক্ষক: জবাবদিহিতা কোথায়?
খোদ পুলিশ ফাঁড়ি থেকে আসামি পালিয়ে যাওয়ার এই ঘটনা স্রেফ ‘দায়িত্বে অবহেলা’ নয়, বরং এর পেছনে গভীর কোনো আর্থিক লেনদেন বা অপরাধী চক্রকে বাঁচানোর পরিকল্পিত যোগসাজশ রয়েছে বলে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করছেন স্থানীয় জনতা। একজন অপরাধীকে এভাবে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়ে আইসি মাকসুদ ও তার সহযোগী পুলিশ সদস্যরা গোটা বাহিনীর ভাবমূর্তিকে ধূলিসাৎ করেছেন।
শর্ষের ভেতর ভূত লুকিয়ে থাকা এই মদুনাঘাট ফাঁড়ির ইনচার্জের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তসহ অবিলম্বে কঠোর আইনি ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করছে সর্বস্তরের সচেতন মহল।


ad728

আলোচিত শীর্ষ ১০ সংবাদ