নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম:
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ হাসানকে নিয়ে সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ নিয়ে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। তার অভিযোগ, পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্ত ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই না করেই তাকে কেন্দ্র করে একপাক্ষিক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সংবাদ প্রকাশ করা হচ্ছে। এতে তার ব্যক্তিগত ও পেশাগত সুনাম মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি বিচারাধীন একটি বিষয়কে জনসমক্ষে এমনভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, যেন আদালতের রায় ইতোমধ্যেই হয়ে গেছে।
প্রকৌশলী হাসানের ভাষ্যমতে, যে প্রকল্পের কাজকে কেন্দ্র করে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) স্পেশাল মামলা নং-৪১/২০১২ ও ৪৩/২০১২ দায়ের করা হয়েছে, সেই প্রকল্পে তার দায়িত্ব পালনের সময়কাল ছিল মাত্র ১০ দিন।
তিনি ২০০৮ সালের ৮ জুন দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর সরেজমিনে প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে দেখতে পান যে, প্রকল্পের কাজ ইতোমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে। কাজটি তার দায়িত্ব গ্রহণের আগেই পূর্ববর্তী সহকারী ও নির্বাহী প্রকৌশলীদের তত্ত্বাবধানে বাস্তবায়িত হয়েছিল। পরবর্তীতে উপ-সহকারী প্রকৌশলীর প্রত্যয়ন এবং সংশ্লিষ্ট দাপ্তরিক নথিপত্রের ভিত্তিতে ঠিকাদারের প্রথম চলমান বা ১ম রানিং বিলের কার্যক্রম অগ্রসর করা হয় বলে জানান তিনি। তার দাপ্তরিক নোটেও দায়িত্ব গ্রহণের পর সরেজমিনে কাজ সম্পন্ন অবস্থায় পাওয়ার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল।
প্রকৌশলী হাসানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মামলা দুটির সঙ্গে জড়িত বিল ও দাবিকৃত অর্থের পরিমাণ নিচে তুলে ধরা হলো:
ঠিকাদারসহ সিডিএর চার প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে এই মামলাগুলো দায়ের করা হয়েছিল। প্রকৌশলী হাসানের প্রশ্ন—প্রকল্পের কাজ যদি তার দায়িত্ব গ্রহণের আগেই সম্পন্ন হয়ে থাকে এবং তিনি দায়িত্ব পালনের মাত্র ১০ দিনের মধ্যে বিলের কার্যক্রমে যুক্ত হয়ে থাকেন, তবে পূর্ববর্তী পর্যায়ের কাজের দায় কীভাবে তার ওপর বর্তায়?
তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলে প্রকৌশলী হাসান বলেন, পরবর্তীতে পুনঃপরিমাপের সময় কার্পেটিংয়ের নিচে থাকা সাব-বেজ (Sub Base) ও সাব-গ্রেড (Sub Grade) কীভাবে নির্ধারণ ও পরিমাপ করে ঘাটতি দেখানো হয়েছে, তা প্রকৌশলগত দৃষ্টিকোন থেকে স্পষ্ট নয়। রাস্তার দৃশ্যমান স্তরের নিচে থাকা উপাদানের পরিমাণ নির্ধারণে অনুসরণ করা পদ্ধতি বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
এছাড়া, একই প্রকল্পকে কেন্দ্র করে দুদক মোট ২২টি মামলা দায়ের করলেও, অন্য মামলার সাথে সংশ্লিষ্ট একাধিক প্রকৌশলী বর্তমানে সিডিএতে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, নির্বাহী প্রকৌশলী এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। অথচ অন্যদের ছাড় দেওয়া হলেও তার ক্ষেত্রেই কেন সাময়িক বরখাস্তসহ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হলো, সেই প্রশ্ন তুলে সব অভিযুক্তের ক্ষেত্রে সম-মূল্যায়নের দাবি জানিয়েছেন তিনি।
মামলাগুলো বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। হাইকোর্ট সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে মামলার ওপর স্থিতাবস্থার আদেশ দিয়েছেন বলে জানান প্রকৌশলী হাসান। তার মতে, চূড়ান্ত রায় আসার আগেই কাউকে দোষী হিসেবে উপস্থাপন করা আইনগত ও নৈতিক—উভয় দিক থেকেই প্রশ্নবিদ্ধ।
তৎকালীন বিএনপি সরকারের আমলে বাস্তবায়িত প্রকল্প হওয়ায় রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অংশ হিসেবে মামলাগুলো দায়ের করা হয়ে থাকতে পারে বলে তার ধারণা। বিগত সরকারের সময়ে তিনি ন্যায্য শুনানির সুযোগ পাননি, তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হবে বলে তিনি আশাবাদী।
সম্প্রতি প্রকাশিত সংবাদে তার কোনো বক্তব্য নেওয়া হয়নি এবং মামলার নথিপত্র ও প্রকৃত ভূমিকার বিষয়টি এড়িয়ে একটি স্বার্থান্বেষী মহল পরিকল্পিতভাবে অপপ্রচার চালাচ্ছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন প্রকৌশলী হাসান।
তিনি গণমাধ্যমকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, কোনো কর্মকর্তা বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশের আগে মামলার এজাহার, চার্জশিট, আদালতের আদেশ, দাপ্তরিক নথি এবং বাস্তব পরিস্থিতি যাচাই করা উচিত। একই সঙ্গে অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্য নেওয়াও সাংবাদিকতার মৌলিক দায়িত্ব।
তার দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা—তিনি কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকলে আইন অনুযায়ী শাস্তি মাথা পেতে নেবেন, তবে বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার আগেই যেন কাউকে অপরাধী হিসেবে প্রতিষ্ঠা না করা হয়।
আপনার মতামত লিখুন :