বাংলাদেশের রাজনীতিতে সিদ্ধান্তের চেয়ে ‘আইওয়াশ’ কি বেশি?


FavIcon
প্রতিদিনের কণ্ঠস্বর ডেক্সঃ
  • প্রকাশিত : ৩১ মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
জেনারেট ফটোকার্ড

ছবির ক্যাপশন:


মোঃ মহিব উল্যাহ সোহেল,নির্বাহী সম্পাদক দৈনিক প্রতিদিনের কণ্ঠস্বর 

বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি প্রশ্ন নাগরিক সমাজে তীব্রভাবে আলোচিত হচ্ছে— রাজনীতিতে কি প্রকৃত কাঠামোগত সংস্কার হচ্ছে, নাকি সবটাই জনতুষ্টির জন্য এক ধরনের ‘আইওয়াশ’ বা লোকদেখানো তৎপরতা? ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর ২০২৫ ও ২০২৬ সালে এসে দেশের রাজনীতিতে যে নতুন মেরুকরণ তৈরি হয়েছে, তা এই বিতর্ককে আরও উস্কে দিয়েছে। একদিকে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা ভাঙার প্রত্যয়, অন্যদিকে বাস্তব ফলাফলের ধীরগতি—এই দুইয়ের দোলাচলে দুলছে বর্তমান বাংলাদেশ।


সংস্কার বনাম ‘আইওয়াশ’ বিতর্ক: প্রেক্ষাপট [২০২৫-২০২৬ ] বিগত গণ-অভ্যুত্থানের পর বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন বা রূপান্তরকালীন সরকার নির্বাচন ব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, police প্রশাসন এবং সংবিধানে বড় ধরনের সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। ২০২৬ সালে এসে নাগরিক সমাজের মূল্যায়ন  খুবই  মিশ্র।  নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতিবিরোধী অভিযান এবং বিচার বিভাগে কিছুটা দৃশ্যমান রদবদল হয়েছে। এগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক সিদ্ধান্তের ভিত্তি বলা যায়। কিন্তু  সমালোচকদের মতে, অনেক ক্ষেত্রেই শুধু 'ব্যক্তি পরিবর্তন' হয়েছে, কিন্তু 'পদ্ধতিগত পরিবর্তন' আসেনি। আমলাতন্ত্র ও পুলিশের ভেতরের পুরোনো দলীয় সংস্কৃতি এখনো পুরোপুরি ভাঙা সম্ভব হয়নি। ফলে অনেক সংস্কার প্রস্তাবই কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে, যা জনমনে ‘আইওয়াশ’ বা কালক্ষেপণের ধারণা তৈরি করছে।২০২৬ সালের নির্বাচনী রোডম্যাপ ও আইনশৃঙ্খলার বাস্তবতা আর ও ভঙ্গুর।


২০২৬ সালের আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মাঠের বড় একটি দলকে বাদ দিয়ে নির্বাচন যা মাঠ পর্যায় থেকে শুরু করে সর্বত্র বিভাজন তৈরির চূড়ান্ত পদক্ষেপ। এটা শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ কোন্দল বা বিভাজন সৃষ্টি  নয় বর্হিঃবিশ্বে ও একটা ভঙ্গুর রাষ্ট্রের দৈন্যতা ফুটে উঠছে। যা ব্যবসা, বানিজ্য ও সহযোগিতার জন্য বড় চ্যালেন্জ।


আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় অস্ত্র উদ্ধার অভিযান চলছে। কিন্তু যে হারে দেশের বিভিন্ন স্থানে এখনো রাজনৈতিক দখলদারিত্বের হাতবদল, চাঁদাবাজি এবং উগ্রপন্থার উত্থান দেখা যাচ্ছে এবং সাম্প্রতিক যে হারে খুন, ধর্ষন ও শিশু নির্যাতন, শিশু ধর্ষনের মতো ঘটনা বেড়ে চলছে তা যে কোন সরকারের জন্য বড় ধরনের প্রশ্নের সৃষ্টি করে।


সুশাসন প্রতিষ্ঠায় দলদাস, আমলাতন্ত্র দূর করা খুব গুরুত্বপূর্ণ। তবে  তৃণমূল পর্যায়ে প্রশাসনিক দুর্বলতা ও সিদ্ধান্তহীনতা স্পষ্ট দৃশ্যমান।


বিশ্লেষকদের মতে, যদি মাঠপর্যায়ে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক সহনশীলতা নিশ্চিত না করা যায় তবে আগামীর বাংলাদেশ পুর্নরগঠন বড় প্রশ্ন?


তবে সংকটের সাময়িক যে সব উপশম মাত্র—যাকে সমালোচকরা ‘রাজনৈতিক বৈধতা পাওয়ার আইওয়াশ’ বলছেন।


অতীতের সরকারগুলো যেভাবে মেগা প্রজেক্টের "উন্নয়ন" দেখিয়ে মানবাধিকার বা সুশাসনের ঘাটতি ঢাকতে চেয়েছিল, বর্তমান ২০২৫-২০২৬ সালের বাস্তবতায় সেই সুযোগ কমে এসেছে।


বর্তমান সময়ে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ডলার সংকট এবং ব্যাংকিং খাতের ভঙ্গুর দশা সাধারণ মানুষকে জর্জরিত করে রেখেছে। বর্তমান সরকার বা রাজনৈতিক দলগুলো আইনি সংস্কারের বড় বড় ঘোষণা দিলেও, সাধারণ মানুষের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—"নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমছে কবে?"


অর্থনৈতিক স্বস্তি দিতে না পারলে যেকোনো রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক সংস্কারই সাধারণ মানুষের কাছে 'আইওয়াশ' বলে মনে হওয়া স্বাভাবিক, কারণ ক্ষুধার্ত পেটে উচ্চমার্গীয় রাজনৈতিক সংস্কারের মূল্য কম।


সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতার জায়গা গুলো হলো ---সিন্ডিকেট ভাঙতে ব্যর্থতা,বাজার সিন্ডিকেট, বিদ্যুৎ - জ্বালানি সংকট, আইন শৃঙ্খলার অবনতি, পরিবহন চাঁদাবাজি বা টেন্ডারবাজির মতো গভীর ক্ষতগুলোর শুধু 'মুখবদল' হয়েছে, অবসান ঘটেনি।


২০২৬ সালের ডিজিটাল যুগে যেকোনো সরকারি পদক্ষেপের ফাঁকফোকর বা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের প্রমাণ ফেসবুক, টিকটক বা এক্স (টুইটার)-এ মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়। ফলে প্রোপাগান্ডা দিয়ে ব্যর্থতা ঢাকা এখন অসম্ভব।


​ভিন্নমত দমন যেন সরকারের আলাদা এজেন্ডা। এটি কি সত্যিই 'আইওয়াশ' নাকি কৌশল এটা ও জনগণের বড় প্রশ্ন?


বাংলাদেশ বর্তমানে এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে "জনগণের প্রত্যাশা আকাশচুম্বী" কিন্তু রাষ্ট্রের সরবরাহ করার সক্ষমতা সীমিত।


২০২৫-২০২৬ সালের রাজনৈতিক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে এটিকে পুরোপুরি 'আইওয়াশ' বা পুরোপুরি 'সফল' বলা যাবে না। তবে এটি স্পষ্ট যে, বাংলাদেশের মানুষ এখন আর চটকদার স্লোগান, তদন্ত কমিটি গঠনের আশ্বাস বা স্রেফ কাগজের রোডম্যাপে বিশ্বাসী নয়।


রাজনীতিতে 'আইওয়াশ' বিতর্ক তখনই বন্ধ হবে, যখন রাজনৈতিক দল ও প্রশাসন বড় বড় ঘোষণার চেয়ে দৃশ্যমান ফলাফল (যেমন: দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ,খুন, ধর্ষণ,শিশু হত্যার বিচার,  থানার নিরপেক্ষ ভূমিকা এবং নিরাপদ ক্যাম্পাস) নিশ্চিত করতে পারবে। শেষ পর্যন্ত, ২০২৬ সালের এই উত্তরণকালীন রাজনীতির গ্রহণযোগ্যতা পরিমাপ করা হবে কোনো কথার ফুলঝুরিতে নয়, বরং সাধারণ মানুষের জীবনের গুণগত পরিবর্তনের দাঁড়িপাল্লায়।


ad728

আলোচিত শীর্ষ ১০ সংবাদ