মাদক সিন্ডিকেটের শিকড় উপড়াতে প্রয়োজন আপসহীন রাজনৈতিক সদিচ্ছা


FavIcon
প্রতিদিনের কণ্ঠস্বর ডেক্সঃ
  • প্রকাশিত : ১৬ জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
জেনারেট ফটোকার্ড

ছবির ক্যাপশন:

সম্পাদকীয় কলম

লেখক:মোঃ মহিব উল্যাহ সোহেল

বাংলা লোকসংস্কৃতির সেই চেনা প্রবাদ— "ঠাকুর ঘরে কে রে? আমি কলা খাই না!" যেন আজ দেশের মাদক বিস্তারের রূঢ় বাস্তবতার সমার্থক হয়ে উঠেছে। মুখে মাদকের বিরুদ্ধে বড় বড় বুলি আর জিরো টলারেন্সের ঘোষণা থাকলেও, ভেতরে ভেতরে অপরাধীদের দায় এড়ানোর এবং নিজেদের ধুয়ে তুলসী পাতা প্রমাণের অপচেষ্টা প্রতিনিয়ত দৃশ্যমান। কিন্তু বাস্তবতা হলো, যখন কোনো মহামারি সমাজকে গ্রাস করে, তখন নেপথ্যের কুশীলবদের আড়াল করা আর সম্ভব হয় না। আজ দেশের মাদক সিন্ডিকেটের সীমাহীন দৌরাত্ম্য এবং তা প্রতিরোধে নানামুখী ব্যর্থতা আমাদের সেই চরম সত্যেরই মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।

​মাদক আজ আর কেবল ব্যক্তি বা পরিবারের অবক্ষয়ের কোনো বিচ্ছিন্ন চিত্র নয়, এটি একটি ভয়াবহ জাতীয় সংকট। আমাদের বিপুল তরুণ প্রজন্ম— যারা দেশের মূল চালিকাশক্তি, তাদের একটা বড় অংশ আজ এই মরণব্যাধির শিকার। একটি সম্ভাবনাময় প্রজন্ম যদি এভাবে ধ্বংসের মুখে গিয়ে দাঁড়ায়, তবে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ যে চরম অন্ধকারের দিকে ধাবিত হবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

​প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নানামুখী তৎপরতা, সীমান্ত নজরদারি এবং মাদকবিরোধী কঠোর আইন থাকা সত্ত্বেও কেন এই বিষাক্ত বাণিজ্য থামানো যাচ্ছে না? উত্তরটি ওপেন সিক্রেট। মাদক ব্যবসা কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, এটি একটি শক্তিশালী এবং প্রভাবশালী অবৈধ অর্থনৈতিক চক্র। এই চক্রের সাথে যখন কোনো প্রভাবশালী স্বার্থগোষ্ঠী বা রাজনৈতিক ছাতা যুক্ত হয়, তখন মাদকবিরোধী সমস্ত রাষ্ট্রীয় উদ্যোগই ভেস্তে যেতে বাধ্য। অপরাধীরা আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যায় আর সাধারণ মানুষের মনে জন্ম নেয় চরম হতাশা।

​আমরা মনে করি, এই সংকট থেকে উত্তরণের একমাত্র চাবিকাঠি হলো— নিরেট রাজনৈতিক সদিচ্ছা। রাষ্ট্র পরিচালনায় নিয়োজিত নেতৃত্বকে সমস্ত দলীয় পরিচয়, ব্যক্তিগত সম্পর্ক কিংবা সাময়িক রাজনৈতিক সমীকরণের ঊর্ধ্বে উঠে অপরাধীকে কেবলই 'অপরাধী' হিসেবে দেখার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। মাদক ব্যবসার নেপথ্যে থাকা গডফাদারদের রাজনৈতিক বা সামাজিক ঢাল পুরোপুরি অপসারণ করতে হবে। একই সাথে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দিতে হবে সম্পূর্ণ পেশাগত স্বাধীনতা, যাতে কোনো অদৃশ্য সুতোর টানে তাদের হাত থমকে না যায়।

​তবে কেবল ডাণ্ডা মেরে বা আইন প্রয়োগ করে এই ব্যাধি নির্মূল করা যাবে না। এর জন্য প্রয়োজন একযোগে সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। পরিবার থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান— সর্বত্র মাদকের বিরুদ্ধে সচেতনতা বাড়াতে হবে। তরুণদের জন্য সুস্থ সংস্কৃতি চর্চা ও খেলার মাঠ নিশ্চিত করার পাশাপাশি, যারা ইতোমধ্যে আক্রান্ত হয়েছে তাদের অপরাধী না ভেবে বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।

​আজ আত্মতুষ্টির কোনো সুযোগ নেই। মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই যদি কেবল আনুষ্ঠানিক সভা-সেমিনার বা লোকদেখানো অভিযানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমাদের জবাবদিহি করার কোনো মুখ থাকবে না। সাময়িক অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক লাভ কখনোই একটি জাতির ভবিষ্যতের চেয়ে বড় হতে পারে না। আমরা আশা করি, সরকার ও প্রশাসন সমস্ত ভণ্ডামি ও আপসকামিতা পরিহার করে সততা ও নৈতিক দৃঢ়তার সাথে এই মরণনেশার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে। একটি সুস্থ, নিরাপদ ও মাদকমুক্ত বাংলাদেশ বিনির্মাণে এর কোনো বিকল্প নেই।


(দৈনিক প্রতিদিনের কণ্ঠস্বর-এর সম্পাদকীয় কলাম থেকে)


ad728

আলোচিত শীর্ষ ১০ সংবাদ