মহিব উল্লাহ সোহেল | ঢাকা
মাদক এখন আর কেবল ব্যক্তিগত নৈতিক স্খলন বা সাময়িক বিচ্যুতি নয়; এটি আজ রূপ নিয়েছে একটি গভীর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তাজনিত সংকটে। বাংলাদেশসহ সমগ্র অঞ্চলেই এর বিস্তার এমন এক আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা দেশের ভবিষ্যৎ তথা তরুণ প্রজন্মের জন্য বড় ধরনের হুমকি তৈরি করছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র ও বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, দেশে মাদক পাচার ও এর ব্যবহার দিন দিন জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত অভিযানে প্রতিনিয়ত বিপুল পরিমাণ ইয়াবা, হেরোইন, আইস ও গাঁজা উদ্ধার হচ্ছে। তবে অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই পরিসংখ্যান বাস্তব চিত্রের একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। বাস্তবে সমাজের ভেতরে যে পরিমাণ মাদক প্রবাহিত হচ্ছে, তা উদ্ধার হওয়া পরিমাণের চেয়ে বহুগুণ বেশি। বিশেষ করে ভৌগোলিক কারণে সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলো মাদক প্রবেশের প্রধান রুট হয়ে উঠেছে, যা নিয়ন্ত্রণ করা প্রশাসনের জন্য এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
অনুসন্ধানে মাদকের এই সর্বগ্রাসী বিস্তারের পেছনে একাধিক জটিল কারণ উঠে এসেছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো—
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, অনেক ক্ষেত্রে তরুণদের কাছে এটি কেবল আসক্তি নয়, বরং এক ধরনের ‘এস্কেপ মেকানিজম’ (Escape Mechanism) হিসেবে কাজ করছে, যার মাধ্যমে তারা বাস্তব জীবনের কঠোর পরিস্থিতি থেকে সাময়িক মুক্তি খোঁজার চেষ্টা করে।
মাদকের ক্ষতিকর প্রভাব কোনো নির্দিষ্ট গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়, এটি বহুমাত্রিক। চিকিৎসকদের মতে, শারীরিকভাবে এটি মানুষের লিভার, কিডনি, হৃদযন্ত্র ও কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রকে ধীরে ধীরে অকেজো করে দেয়। বিশেষ করে ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণের ফলে HIV ও হেপাটাইটিসের মতো মারাত্মক সংক্রামক ব্যাধির ঝুঁকি বহুণ বেড়ে যায়। মানসিকভাবে এটি স্মৃতিশক্তি ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নষ্ট করে, তীব্র বিষণ্ণতা (Depression) সৃষ্টি করে এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়িয়ে তোলে। সামাজিকভাবে এর ফলে পারিবারিক ভাঙন, দাম্পত্য কলহ, শিক্ষাজীবন ধ্বংস এবং সমাজে চুরি, ছিনতাই ও খুনের মতো অপরাধ আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এই সংকটের সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এর মূল শিকার হচ্ছে দেশের সম্ভাবনাময় তরুণ ও কিশোর সমাজ। বয়ঃসন্ধিকালের কৌতূহল, ভুল বন্ধুবান্ধবের নেতিবাচক প্রভাব (Peer Pressure) কিংবা পড়াশোনা ও ক্যারিয়ারের মানসিক চাপ সামলাতে গিয়ে অনেকেই প্রথমবার মাদকের জালে জড়িয়ে পড়ে। আর এটি এমন এক চোরাবালি, যেখানে একবার আসক্তি তৈরি হলে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা অত্যন্ত কঠিন এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া হয়ে দাঁড়ায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অভিযান বা আইনি প্রয়োগ দিয়ে এই ব্যাধির মূলে আঘাত করা সম্ভব নয়। যেহেতু এটি একটি সামাজিক রোগ, তাই এর স্থায়ী সমাধানও হতে হবে সামাজিকভাবে।
১. পারিবারিক সচেতনতা: পরিবারকে প্রথম দুর্গ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। সন্তানের আচরণ, সঙ্গী ও চলাফেরার প্রতি অভিভাবকদের সচেতন ও সংবেদনশীল হতে হবে।
২. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা: স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে নিয়মিত মাদকবিরোধী প্রচারণাসহ শিক্ষার্থীদের মনস্তাত্ত্বিক সহায়তার জন্য কাউন্সেলিং-এর ব্যবস্থা রাখতে হবে।
৩. পুনর্বাসন ও চিকিৎসা: রাষ্ট্রকে আরও শক্তিশালী প্রতিরোধ ব্যবস্থার পাশাপাশি মাদকাসক্তদের অপরাধী না ভেবে রোগী হিসেবে গণ্য করে মানবিক ও সাশ্রয়ী পুনর্বাসন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
মাদক কেবল একজন ব্যক্তিকে নিঃশেষ করে না, বরং একটি পরিবার, সমাজ এবং একটি গোটা জাতির ভবিষ্যৎকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়। দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রাকে টেকসই করতে হলে এই নীরব বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে এখনই সর্বস্তরের মানুষকে সাথে নিয়ে সম্মিলিত সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই।
আপনার মতামত লিখুন :