জুলাই আন্দোলনে স্বর্ণকার মিলনের মৃত্যুর বছর পেরোলেও পরিবারের খোঁজ রাখেনি কেউ
প্রতিদিনের কণ্ঠস্বর ডেক্সঃ
- প্রকাশিত : ১৯ জুলাই, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ
জেনারেট ফটোকার্ড
মাহমুদ ইয়াসিন
স্টাফ রিপোর্টার ঢাকাঃ
গত বছর ১৯ জুলাই রংপুরে গুলিতে নিহত স্বর্ণ শ্রমিক মুসলিম উদ্দিন মিলনের প্রথম শাহাদাতবার্ষিকী আজ। এই দিনে তার স্ত্রী দিলরুবা আক্তার এক সাক্ষাৎকারে স্বামীর হত্যাকাণ্ডের বিচার এবং শহিদ ও আহত পরিবারের পুনর্বাসনের দাবি জানিয়েছেন। তিনি প্রকাশ করেছেন, তার স্বামীর লাশ দাফনের পর যৌথ বাহিনীর অভিযানের শিকার হয়েছিলেন তারা, এমনকি হাসপাতাল থেকে লাশ গুম করারও চেষ্টা করা হয়েছিল।
দিলরুবা আক্তার জানান, তার স্বামী মুসলিম উদ্দিন মিলন, যিনি নগরীর বৌরানী জুয়েলার্সের ম্যানেজার ছিলেন, গত বছর ১৯ জুলাই জুমার নামাজের পর বাসা থেকে বেরিয়ে যান এবং বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে আন্দোলনের সময় পুলিশের গুলিতে নিহত হন। একটি গুলি তার বুকে বিদ্ধ হয়েছিল। তিনি বলেন, তার স্বামী আন্দোলনের সামনের সারিতে ছিলেন। মৃত্যুর পর তার ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে লাশ নিতে গেলে সেখানে তাদের চরম হেনস্তার শিকার হতে হয়। হাসপাতালের কর্মকর্তারা বিভিন্ন ফানেলে ঘুরিয়ে লাশ গুম করার চেষ্টা করেছিলেন। দিলরুবা বলেন, প্রায় ৫০ জন আত্মীয়-স্বজন মিলে লাশ পাহারা দিয়েছিলেন এবং হুমকি দেওয়ার পর রাত ৯টায় তারা লাশ ফেরত পান।
দিলরুবা আক্তার আরও জানান, লাশ দাফনের চার দিনের মাথায় গভীর রাতে (১৯ জুলাই দিবাগত রাত আনুমানিক ২টা) প্রায় ৫০ জন বিজিবি ও পুলিশ সদস্যসহ যৌথ বাহিনীর সদস্যরা তাদের বাড়ি ঘিরে ফেলে। পরিবারের পুরুষ সদস্যরা জানালা ও ছাদ দিয়ে পালিয়ে যান। যৌথ বাহিনী হুমকি-ধমকি দেয় এবং একটি নতুন ফোন নিয়ে যায়। ৫ আগস্ট হাসিনার পতনের আগ পর্যন্ত বাড়ির সকল পুরুষ সদস্য পলাতক ছিলেন। দিলরুবা এই ঘটনাকে "নির্মম ইতিহাস" উল্লেখ করে বলেন, শোকাহত অবস্থায় তাদের গ্রেফতারের চেষ্টা করা হয়েছিল।
দিলরুবা আক্তার জানান, তারা সব হারিয়ে এখন সর্বস্বান্ত। তার দুটি ছোট ছেলে তাদের বাবাকে হারিয়েছে এবং এতিম হয়েছে। তিনি সরকারের কাছে তার সন্তানদের দায়িত্ব নেওয়ার দাবি জানান, কিন্তু এক বছরেও কোনো পদক্ষেপ না দেখতে পেয়ে হতাশা প্রকাশ করেন।
গত বছর ২৭ আগস্ট দিলরুবা আক্তার জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী, রংপুর বিভাগীয় কমিশনার জাকির হোসেন, রংপুর রেঞ্জের সাবেক ডিআইজি আব্দুল বাতেন, রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক কমিশনার মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানসহ ১৭ জনের নাম উল্লেখ করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। পরবর্তীতে আদালত মামলাটি এজাহার হিসেবে গ্রহণ করে তদন্তের নির্দেশ দেয়। এক বছর পেরিয়ে গেলেও এই মামলায় মাত্র দুজন গ্রেফতার হয়েছেন। বর্তমানে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) মামলাটি তদন্ত করছে। গত বছর ১৫ সেপ্টেম্বর তদন্তের স্বার্থে মুসলিম উদ্দিন মিলনের লাশ মুন্সিপাড়া কবরস্থান থেকে উত্তোলন করা হয়েছিল।
দিলরুবা আক্তার শহীদ ও আহত পরিবারগুলোকে দ্রুত পুনর্বাসনের আওতায় আনা এবং মাসিক ভাতা চালুর দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, পরিবারগুলো কীভাবে চলবে, কীভাবে বাঁচবে, তা নিয়ে সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নিক।
উল্লেখ্য, গত বছর ১৬ জুলাই রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে শিক্ষার্থী আবু সাঈদ পুলিশের গুলিতে নিহত হন। এরপর ১৮ জুলাই মডার্ন মোড়ে অটোচালক মানিক মিয়া নিহত হন। ১৯ জুলাই সিটি বাজারের সামনে পুলিশ ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের গুলিতে কলা ব্যবসায়ী মেরাজুল ইসলাম, স্বর্ণ শ্রমিক মুসলিম উদ্দিন মিলন, সবজি ব্যবসায়ী সাজ্জাদ এবং শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ আল তাহিরও প্রাণ হারান।
আপনার মতামত লিখুন :