প্রথম পর্ব | ১,৮৮২ কোটি টাকার প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ, বরখাস্তের ১২ দিনেই পুনর্বহাল!
____________________________________________
অনুসন্ধানী প্রতিবেদক, ঢাকা:
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ডিপিএইচই) একাধিক উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) তবিবুর রহমান তালুকদারকে ঘিরে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত গ্রামীণ পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ, সাময়িক বরখাস্ত এবং মাত্র ১২ দিনের মাথায় পুনর্বহালের ঘটনায় আলোচনায় আসে তাঁর নাম। পাশাপাশি তাঁর ও পরিবারের সদস্যদের নামে বিপুল সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
প্রকাশিত প্রতিবেদন ও সরকারি প্রজ্ঞাপনের বিবরণ অনুযায়ী, প্রকল্পের অর্থ ব্যয়, বাস্তবায়ন কার্যক্রম এবং বিভাগীয় তদন্তের সিদ্ধান্ত নিয়ে একাধিক প্রশ্ন সামনে এসেছে। তবে এসব অভিযোগের প্রকৃত সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি, তদন্ত প্রতিবেদন ও সম্পদ বিবরণী যাচাই করা জরুরি।
মেগা প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ:
মানবসম্পদ উন্নয়নে গ্রামীণ পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ১ হাজার ৮৮২ কোটি টাকা। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নেওয়া এ প্রকল্পে অর্থ ব্যয়, কাজের মান, বিল-ভাউচার এবং ঠিকাদারি কার্যক্রম নিয়ে বিভিন্ন সময়ে অনিয়মের অভিযোগ প্রকাশিত হয়।
বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়নে অনিয়ম, ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি এবং ঠিকাদারদের কাছ থেকে কমিশন নেওয়ার অভিযোগ তোলা হয়েছে। এসব অভিযোগের প্রতিটি বিষয়ে কী ধরনের প্রমাণ পাওয়া গেছে, কত টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে—তা নিশ্চিত করতে মূল তদন্ত প্রতিবেদন, নিরীক্ষা নথি ও প্রকল্পের ব্যয়ের হিসাব যাচাই করা প্রয়োজন।
এক কর্মকর্তার হাতে একাধিক প্রকল্পের দায়িত্ব:
গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তবিবুর রহমান তালুকদারকে প্রায় ১ হাজার ৯৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ের আরেকটি উন্নয়ন প্রকল্পের দায়িত্ব দেওয়া নিয়েও সমালোচনা হয়। এর ফলে দুটি প্রকল্পের মোট বরাদ্দ দাঁড়ায় প্রায় ৩ হাজার ৮৭১ কোটি টাকা।
এত বড় অঙ্কের উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যবস্থাপনা, ব্যয়ের স্বচ্ছতা এবং তদারকির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তবে দুটি প্রকল্পে একই কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন নিজে থেকে দুর্নীতির প্রমাণ নয়; প্রকল্পের অনুমোদন, নিয়োগসংক্রান্ত আদেশ এবং বাস্তবায়ন অগ্রগতির নথি দিয়ে বিষয়টি মূল্যায়ন করা জরুরি।
সাময়িক বরখাস্তের পর ১২ দিনের মাথায় পুনর্বহাল:
তবিবুর রহমান তালুকদারকে ঘিরে সবচেয়ে আলোচিত প্রশাসনিক ঘটনা ঘটে ২০২৬ সালের এপ্রিলে।
বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সরকারি প্রজ্ঞাপনের বিবরণ অনুযায়ী, ৯ এপ্রিল জারি করা আদেশে তাঁর বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিভাগীয় মামলা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
কিন্তু ২২ এপ্রিল জারি করা পরবর্তী প্রজ্ঞাপনে বিভাগীয় মামলা নং ০১/২০২৬-এ তাঁর বিরুদ্ধে অসদাচরণ ও দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি বলে উল্লেখ করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে সাময়িক বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করে তাঁকে আগের প্রকল্প পরিচালক পদে পুনর্বহাল করা হয়। বরখাস্তকালীন সময়ও কর্মকাল হিসেবে গণ্য করার নির্দেশ দেওয়া হয় বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
একই কর্মকর্তাকে ঘিরে অল্প সময়ের ব্যবধানে দুটি প্রজ্ঞাপনে ভিন্ন সিদ্ধান্তের বিষয়টি জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রশ্ন তৈরি করেছে। প্রথম আদেশে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার কথা বলা হয়ে থাকলে, পরবর্তী আদেশে কোন তথ্য-প্রমাণ ও প্রক্রিয়ায় অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো—তা স্পষ্ট হওয়া জরুরি।
তবে বিভাগীয় তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ার সরকারি সিদ্ধান্তও প্রতিবেদনে যথাযথভাবে বিবেচনায় নিতে হবে। অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না।
সম্পদ নিয়ে অভিযোগ, প্রয়োজন নথিভিত্তিক অনুসন্ধান:
বিভিন্ন গণমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে তবিবুর রহমান তালুকদার এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে ঢাকা ও সিরাজগঞ্জের কাজীপুর এলাকায় বিপুল সম্পদ থাকার অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে। সম্পদের উৎস, মালিকানা, ক্রয়মূল্য এবং আয়ের সঙ্গে সম্পদের সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
এ ছাড়া পরিবারের সদস্য ও নিকটাত্মীয়দের নামে সম্পদ রাখার মাধ্যমে প্রকৃত মালিকানা আড়াল করার অভিযোগও প্রকাশিত হয়েছে। তবে এসব দাবির সত্যতা প্রতিষ্ঠায় জমির দলিল, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের নথি, সম্পদ বিবরণী, আয়কর রিটার্ন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুসন্ধান বা তদন্তের ফলাফল যাচাই করা প্রয়োজন। নির্ভরযোগ্য নথি ছাড়া এসব অভিযোগকে প্রমাণিত অবৈধ সম্পদ হিসেবে উপস্থাপন করা সমীচীন নয়।
যেসব প্রশ্নের উত্তর জরুরি:
প্রকল্পের ব্যয় ও বাস্তবায়ন নিয়ে ওঠা অভিযোগ এবং বরখাস্ত থেকে পুনর্বহালের ঘটনায় কয়েকটি প্রশ্নের জবাব জনস্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ:
১.প্রথম তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে ঠিক কোন অনিয়মের কথা বলা হয়েছিল?
২.বিভাগীয় মামলা নিষ্পত্তির আগে কী ধরনের নথি, সাক্ষ্য ও ব্যয়ের হিসাব পর্যালোচনা করা হয়েছিল?
৩.৯ এপ্রিলের বরখাস্তের আদেশ এবং ২২ এপ্রিলের পুনর্বহালের আদেশের মধ্যবর্তী সময়ে কী প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়?
৪.প্রকল্পের ব্যয়, কাজের মান ও ঠিকাদারি বিলের বিষয়ে কোনো নিরীক্ষা আপত্তি বা আর্থিক ক্ষতির হিসাব রয়েছে কি না?
৫.তবিবুর রহমান তালুকদার ও তাঁর পরিবারের নামে সম্পদের অভিযোগের বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান হয়েছে কি না?
এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে স্থানীয় সরকার বিভাগ, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, প্রকল্পের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে দুর্নীতি দমন কমিশনের নথি যাচাই করা প্রয়োজন।
তবিবুর রহমানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি:
উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে তবিবুর রহমান তালুকদারের বক্তব্য জানতে তাঁর মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়ে বক্তব্য জানতে চাওয়া হলে তিনি ব্যস্ত আছেন, পরে কথা বলবেন বলে জানান এবং সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন। ফলে প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত তাঁর বিস্তারিত বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথ গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করা হবে।
প্রথম পর্বের পর্যবেক্ষণ:
প্রায় ১ হাজার ৮৮২ কোটি টাকার প্রকল্প ঘিরে ওঠা অনিয়মের অভিযোগ, সাময়িক বরখাস্ত এবং ১২ দিনের মাথায় পুনর্বহালের ঘটনাপ্রবাহ জনস্বার্থে আরও নথিভিত্তিক অনুসন্ধানের দাবি রাখে। প্রকল্পের ব্যয়, তদন্তের ফলাফল, বিভাগীয় মামলার নিষ্পত্তি এবং সম্পদসংক্রান্ত অভিযোগের প্রকৃত চিত্র জানতে সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য যাচাই করা জরুরি। অভিযোগ ও প্রমাণিত তথ্যের পার্থক্য বজায় রেখে এসব বিষয়ের অনুসন্ধান অব্যাহত থাকবে।
ধারাবাহিক প্রতিবেদন চলবে…
আপনার মতামত লিখুন :