অনুমোদন নেই, তবু সড়কে ডাবল-ডেকার স্লিপার বাস, চলছে কার ছত্রছায়ায়?


FavIcon
প্রতিদিনের কণ্ঠস্বর ডেক্সঃ
  • প্রকাশিত : ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
জেনারেট ফটোকার্ড

ছবির ক্যাপশন:


এনামুল হক রাশেদী, স্টাফ রিপোর্টার
দেশে ডাবল-ডেকার স্লিপার বাসের অনুমোদন বা রেজিস্ট্রেশন দেয়নি বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। এ ধরনের বাস চলাচলের জন্য নেই নির্দিষ্ট কোনো নীতিমালাও। অথচ রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন মহাসড়কে দীর্ঘদিন ধরে যাত্রী নিয়ে চলাচল করছে বিলাসবহুল এসব বাস।
এদিকে অনুমোদিত সিঙ্গেল-ডেকার বাসের কাঠামো পরিবর্তন করে ডাবল-ডেকার স্লিপার বাসে রূপান্তরের অভিযোগে ৪১টি বাসের রেজিস্ট্রেশন স্থগিত করেছে বিআরটিএ।

বুধবার হাইকোর্টে দাখিল করা বিআরটিএর প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এখন পর্যন্ত কোনো ডাবল-ডেকার স্লিপার বাসের অনুমোদন বা রেজিস্ট্রেশন দেওয়া হয়নি। তবে মাঠপর্যায়ে এ ধরনের বাসের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে তিনটি বাসের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।

অনুমোদিত বাসের কাঠামো পরিবর্তনের অভিযোগ বিআরটিএর কারিগরি কমিটির পর্যালোচনায় দেখা গেছে, কিছু বাস প্রথমে সিঙ্গেল-ডেকার হিসেবে রেজিস্ট্রেশন নেয়। পরে সেগুলোর বডি পরিবর্তন করে ডাবল-ডেকার স্লিপার বাসে রূপান্তর করা হয়। এমন অভিযোগের ভিত্তিতে ৪১টি বাসের রেজিস্ট্রেশন স্থগিত করা হয়েছে। তবে প্রশ্ন উঠেছে, কাঠামো পরিবর্তনের পর এসব বাস কীভাবে ফিটনেস সনদ ও রুট পারমিট পেল? দীর্ঘদিন ধরে এসব বাস মহাসড়কে চলাচল করলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে এলো না কেন?

স্থানীয়ভাবে তৈরি হচ্ছে ডাবল-ডেকার স্লিপার বাস তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, ঢাকার গাবতলীর এসএন বডি বিল্ডার্স সম্প্রতি দক্ষিণাঞ্চলের বলেশ্বর পরিবহনের জন্য দুটি ডাবল-ডেকার স্লিপার বাস তৈরি করেছে।

ভারতীয় একটি কোম্পানির ১২ মিটার চেসিসের ওপর তৈরি বাস দুটির নিচতলায় রয়েছে ২৮টি আসন এবং ওপরতলায় ১৭টি বিছানা। সামনের দিকে সিঁড়ি দিয়ে ওপরতলায় ওঠানামার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
চেসিস প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, ওই চেসিসে নির্দিষ্ট বিন্যাসে স্লিপার সিট তৈরি করা সম্ভব হলেও দোতলা বাসের কাঠামো তৈরির বিষয়টি উল্লেখ নেই।
এসএন বডি বিল্ডার্সের মালিক হাফিজ উদ্দীন জানিয়েছেন, বাস মালিকপক্ষ ইন্দোনেশিয়ার একটি বাস বডি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের ক্যাটালগ দেখে বাস দুটির কাঠামো তৈরি করেছে। ডেলিভারির আগে কয়েক দিন বাস দুটি চালিয়ে পরীক্ষা করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ এসব বাসকে ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করেন। তাঁর মতে, দেশে আসা কিছু চেসিস সিঙ্গেল-ডেকার বাস হিসেবে অনুমোদিত হলেও সেগুলোর ওপর স্থানীয়ভাবে ডাবল-ডেকার কাঠামো তৈরি করে স্লিপার বাস হিসেবে চালানো হচ্ছে।

তিনি প্রশ্ন তোলেন, বিআরটিএ যথাযথ যাচাই না করেই এসব বাসের রেজিস্ট্রেশন ও রুট পারমিট দিয়েছে কি না। অন্যদিকে, বাংলাদেশ অটোমোবাইল বডি ম্যানুফ্যাকচারিং অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. মোর্শেদ আলী বলেন, বিদেশ থেকে ডাবল-ডেকার বাস চলতে পারলে দেশে তৈরি বাস কেন চলতে পারবে না? কারিগরি ত্রুটি থাকলে বডি নির্মাতাদের ডেকে বিষয়টি জানানো উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বুয়েটের পরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম শামসুল হক বলেন, সিঙ্গেল-ডেকার বাসের চেসিসের ওপর ডাবল-ডেকার কাঠামো তৈরি করা হলে তা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। বাসের উচ্চতা বাড়লে ভারকেন্দ্র, স্থিতিশীলতা, ব্রেকিং সক্ষমতা ও বাঁক নেওয়ার সময় আচরণসহ বিভিন্ন বিষয় নতুন করে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

দুর্ঘটনায় বাড়ছে উদ্বেগ চলতি বছর দেশের বিভিন্ন স্থানে স্লিপার বাস দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে। জানুয়ারিতে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে একটি ডাবল-ডেকার স্লিপার বাসের ধাক্কায় তিনজন নিহত হন। মার্চে দিনাজপুরের বিরামপুরে স্লিপার বাসের ধাক্কায় দুজন নিহত হন। সেপ্টেম্বরের শুরুতে পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় একটি স্লিপার বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে অন্তত ছয়জন আহত হন। ৬ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের চকরিয়ায় স্লিপার বাসের ধাক্কায় এক বৃদ্ধা নিহত ও তাঁর নাতনি আহত হন।

এসব দুর্ঘটনার জন্য বাসের কাঠামোগত ত্রুটিকে সরাসরি দায়ী করার সুযোগ নেই। তবে অনুমোদনহীন কাঠামোর যানবাহন কীভাবে নিরাপত্তা পরীক্ষার বাইরে থেকে সড়কে চলাচল করছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
প্রয়োজন পূর্ণাঙ্গ তদন্ত
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডাবল-ডেকার স্লিপার বাসের উচ্চতা, ভারকেন্দ্র, যাত্রীবহন ব্যবস্থা, জরুরি বহির্গমন ও অগ্নিনিরাপত্তা আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে দেশের সব সড়ক, সেতু ও ফ্লাইওভার এ ধরনের বাস চলাচলের উপযোগী কি না, তা রুটভিত্তিকভাবে পরীক্ষা করা জরুরি।
বিআরটিএ জানিয়েছে, উন্নত দেশের অভিজ্ঞতার আলোকে ডাবল-ডেকার স্লিপার বাসের অনুমোদন ও নিয়ন্ত্রণে জাতীয় নীতিমালা তৈরির কাজ চলছে।

তবে এর আগে সড়কে চলাচলকারী এসব বাসের প্রকৃত সংখ্যা, কাঠামো পরিবর্তনের তথ্য, ফিটনেস ও রুট পারমিটের বৈধতা যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।

অনুমোদন না থাকা সত্ত্বেও বছরের পর বছর এসব বাস কীভাবে সড়কে চলাচল করেছে, কারা অনুমোদিত কাঠামো পরিবর্তনের সুযোগ দিয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারিতে ঘাটতি ছিল কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।


ad728

আলোচিত শীর্ষ ১০ সংবাদ