ইনকিয়াদ আহম্মেদ রাফিন, ঝিকরগাছা (যশোর) প্রতিনিধি:
দেশের বস্ত্রশিল্পের প্রধান কাঁচামাল তুলা। আমদানিনির্ভরতা কমাতে সরকার কৃষকদের প্রণোদনার মাধ্যমে তুলা চাষ সম্প্রসারণে ব্যাপক উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু যশোর অঞ্চলে এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের কারসাজিতে তুলা চাষিরা চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন। মানহীন তুলা বীজ কৃষকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে, যা এই সম্ভাবনাময় সেক্টরে অশনি সংকেত বয়ে আনছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বাংলাদেশ তুলা উন্নয়ন বোর্ডের আওতাধীন বৃহত্তর যশোর রিজিয়নের ১৬টি ইউনিটের ৩ হাজার প্রণোদনাভুক্ত কৃষক রয়েছেন। তুলা চাষিদের অভিযোগ, তারা অধিক ফলনশীল ‘হোয়াইট গোল্ড-১ ও ২’ ব্র্যান্ডের বীজ চাইলেও কর্তৃপক্ষ তাদের ওপর ‘লাল তীর’ ও ‘বিএম-৪’ ব্র্যান্ডের নিম্নমানের বীজ চাপিয়ে দিচ্ছে।
ভুক্তভোগী কৃষকদের দাবি, বিগত বছরগুলোতে ‘লাল তীর’ ব্র্যান্ডের বীজ ব্যবহার করে তারা কাঙ্ক্ষিত ফলন পাননি। অথচ ‘হোয়াইট গোল্ড’ ব্র্যান্ডের বীজে প্রতি বিঘা জমিতে ১০ থেকে ১২ মণ তুলা পাওয়া সম্ভব। কৃষকরা অভিযোগ করেন, যশোর জোনের প্রধান তুলা উন্নয়ন কর্মকর্তা মিজানুর রহমানের নির্দেশনায় মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা তাদের অনিচ্ছাসত্ত্বেও এই বিতর্কিত ও পুরাতন বীজ নিতে বাধ্য করছেন।
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ ও বারোবাজার ইউনিটের কয়েকশ কৃষকের মাঝে এরই মধ্যে এই বীজ সরবরাহ করা হয়েছে, যার অঙ্কুরোদ্গম ক্ষমতা অত্যন্ত কম বলে দাবি কৃষকদের।
এ বিষয়ে ঝিকরগাছা ইউনিট-১ এর কর্মকর্তা আসাদ হোসেন জানান, তারা নিয়ম অনুযায়ী সরবরাহকৃত বীজ বিতরণ করছেন। চৌগাছা ও হাকিমপুর ইউনিটের কর্মকর্তা আবু সাঈদ জানান, তারা চাহিদার বিপরীতে যে বীজ পাচ্ছেন, তা-ই বিতরণ করছেন। কৃষকদের অনিচ্ছার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে যশোর জোনের প্রধান তুলা উন্নয়ন কর্মকর্তা মিজানুর রহমান সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, “সরকার প্রণোদনা হিসেবে বীজ সরবরাহ করে। লাল তীর বা সুপ্রিম—সব কোম্পানির বীজেরই মান ভালো। গেজেট ও রেজুলেশন অনুযায়ী বীজ সরবরাহ করা হয়। কোনো কোম্পানি সরবরাহ করতে ব্যর্থ হলে বিকল্প হিসেবে যা পাওয়া যায়, তাই বিতরণ করতে হয়। আমরা সব সময় কৃষকের স্বার্থ দেখি।”
বিষয়টি নিয়ে যশোর জোনের উপ-পরিচালক (ডিডি) মোজাদ্দেল আল শামীমের সাথে যোগাযোগের একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
কৃষকদের মতে, প্রতি বিঘা জমিতে প্রায় ১৫ মণ তুলা উৎপাদন সম্ভব, যার বাজারমূল্য প্রায় ৬০ হাজার টাকা। সরকারি প্রণোদনার বীজ, সার ও কীটনাশক পাওয়ার আশায় কৃষকরা এই খাতে ঝুঁকেছেন। কিন্তু বীজের মান নিয়ে এই কারসাজি চলতে থাকলে দেশের তুলা বিপ্লব মুখ থুবড়ে পড়বে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তুলাবীজ থেকে প্রাপ্ত তেল কোলেস্টেরলমুক্ত এবং খৈল পশু ও মাছের ভালো খাদ্য। সামগ্রিক এই খাত ধ্বংসের ষড়যন্ত্র রুখতে সরকারের উচ্চপর্যায়ে তদন্ত প্রয়োজন। অসাধু সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে তুলা চাষিদের এই বিশাল জনগোষ্ঠী পথে বসার উপক্রম হবে।
আপনার মতামত লিখুন :