রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে মোকাবিলা হোক রাজনীতি দিয়ে, কোনো অপশক্তি দিয়ে নয়
প্রতিদিনের কণ্ঠস্বর ডেক্সঃ
- প্রকাশিত : ২৩ জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
জেনারেট ফটোকার্ড
মোঃ মহিব উল্যাহ সোহেল
নির্বাহী সম্পাদক, প্রতিদিনের কণ্ঠস্বর।
গণতন্ত্রের প্রকৃত সৌন্দর্য ক্ষমতায় থাকা বা ক্ষমতায় যাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং ভিন্নমতকে সম্মান করার সংস্কৃতির মধ্যেই এর প্রকৃত শক্তি নিহিত। যে রাষ্ট্রে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা হয়, শত্রু হিসেবে নয়, সেই রাষ্ট্রেই গণতন্ত্র দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়ায়। অন্যদিকে, যখন রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা যুক্তি, নীতি ও কর্মসূচির পরিবর্তে ভয়ভীতি, সহিংসতা, অপপ্রচার কিংবা অন্য কোনো অনৈতিক পন্থার দিকে ঝুঁকে পড়ে, তখন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে পড়ে এবং জনগণের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বাংলাদেশের সংবিধান একটি গণতান্ত্রিক, আইনভিত্তিক ও জনগণের সার্বভৌমত্বের রাষ্ট্রব্যবস্থার কথা বলে। সংবিধানের মূলনীতি এবং নাগরিক অধিকার সম্পর্কিত বিধানগুলো রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং আইনের শাসনের গুরুত্ব তুলে ধরে। এসব নীতির আলোকে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা হওয়া উচিত শান্তিপূর্ণ, আইনসম্মত এবং জনগণের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি কোনো বাধা নয়; বরং জবাবদিহি নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। শক্তিশালী বিরোধী মত, গঠনমূলক সমালোচনা এবং নীতিনির্ভর বিতর্ক সরকারের কার্যক্রমকে আরও স্বচ্ছ ও কার্যকর করতে সহায়তা করে। তাই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দুর্বল করার পরিবর্তে রাজনৈতিক যুক্তির মাধ্যমে মোকাবিলা করাই গণতান্ত্রিক চর্চার পরিচয়।
ইতিহাসে দেখা যায়, যে সমাজে সংলাপের পরিবর্তে সংঘাত, যুক্তির পরিবর্তে শক্তি এবং সহনশীলতার পরিবর্তে প্রতিহিংসা প্রাধান্য পেয়েছে, সেখানে রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক ক্ষতি এবং সামাজিক বিভাজন বেড়েছে। বিপরীতে, যেখানে রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচন, সংসদ, জনমত এবং শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে, সেখানে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান আরও শক্তিশালী হয়েছে এবং উন্নয়নের পথ সুগম হয়েছে।
বর্তমান বিশ্বে উন্নয়নের অন্যতম পূর্বশর্ত হলো রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। কিন্তু স্থিতিশীলতা কখনো ভিন্নমত দমনের মাধ্যমে আসে না; বরং আইনের সমান প্রয়োগ, কার্যকর প্রতিষ্ঠান, সুষ্ঠু নির্বাচন, সংলাপের পরিবেশ এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়। রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত নিজেদের কর্মসূচি, সুশাসনের পরিকল্পনা এবং জনকল্যাণমূলক উদ্যোগের মাধ্যমে জনগণের আস্থা অর্জনের প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া।
যুবসমাজ আজ রাজনীতিকে নতুন চোখে দেখতে চায়। তারা এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রত্যাশা করে, যেখানে নেতৃত্বের মানদণ্ড হবে সততা, দক্ষতা, জবাবদিহি এবং জনসেবা। যদি তারা সহিংসতা ও প্রতিহিংসার পরিবর্তে যুক্তিনির্ভর রাজনৈতিক সংস্কৃতি দেখতে পায়, তবে ভবিষ্যতের নেতৃত্ব আরও দায়িত্বশীল ও গণমুখী হবে।
গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সচেতন নাগরিকদেরও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তথ্যভিত্তিক আলোচনা, গঠনমূলক সমালোচনা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের পরিবেশ তৈরি করতে পারলে রাজনৈতিক সংস্কৃতি আরও ইতিবাচক হতে পারে।
আজ সময়ের দাবি—রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে পরাজিত করার চেষ্টা হোক জনগণের ভালোবাসা অর্জনের মাধ্যমে, উন্নয়নের প্রতিযোগিতায়, নৈতিক নেতৃত্বে এবং জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে। মতের ভিন্নতা থাকবে, বিতর্ক থাকবে, নির্বাচন হবে—কিন্তু কোনো মতভেদ যেন সহিংসতা, ভয়ভীতি বা অনৈতিক পন্থায় রূপ না নেয়।
একটি উন্নত, মানবিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়তে আমাদের সম্মিলিত প্রত্যাশা—রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে মোকাবিলা হোক রাজনীতি দিয়ে, যুক্তি দিয়ে, নীতি দিয়ে এবং জনগণের রায়ের মাধ্যমে; কোনো অপশক্তি বা অপকৌশল দিয়ে নয়। কারণ গণতন্ত্রে শেষ কথা বলে জনগণ, আর জনগণের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধাই একটি সভ্য রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ শক্তি।
আপনার মতামত লিখুন :