ন্যায়বিচারের বদলে নির্মমতা: আহত মানুষের আর্তনাদে কি রাষ্ট্র নীরব থাকবে?


FavIcon
প্রতিদিনের কণ্ঠস্বর ডেক্সঃ
  • প্রকাশিত : ১১ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
জেনারেট ফটোকার্ড

ছবির ক্যাপশন:



মোঃ আলমগীর হোসাইন রাজা চৌধুরী
নিজস্ব প্রতিবেদক:
রাজনীতি কখনোই নিষ্ঠুরতার প্রতিযোগিতা হওয়ার কথা নয়। রাষ্ট্র পরিচালনার মূল চেতনা হওয়া উচিত মানবিকতা, ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন। কিন্তু সাম্প্রতিক বাস্তবতা যেন আমাদের সামনে এক ভিন্ন, উদ্বেগজনক ও বেদনাদায়ক চিত্র তুলে ধরছে—যেখানে মানবিকতা হারিয়ে যাচ্ছে ক্ষমতার চাপে, আর ন্যায়বিচার হয়ে পড়ছে প্রশ্নবিদ্ধ।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক তৌহিদ তুহিন—একজন রাজনৈতিক কর্মী, একজন মানুষ—আজ সেই নির্মম বাস্তবতারই প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছেন। তিনি একসময় সন্ত্রাসী হামলার শিকার হন। অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা তাকে কুপিয়ে, গুলি করে মৃত ভেবে ড্রেনে ফেলে রেখে যায়। ঘটনাটি কোনো কল্পকাহিনি নয়, বরং আমাদের সমাজের এক বিভীষিকাময় প্রতিচ্ছবি।

অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, ভাগ্যের জোরে তিনি বেঁচে যান। কিন্তু সেই বেঁচে থাকাই যেন আজ তার জন্য এক অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গুরুতর আহত অবস্থায় চিকিৎসাধীন থাকাকালীন তাকে গ্রেফতার করা হয়। বর্তমানে তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর ক্ষত, পচন এবং সংক্রমণ দেখা দিয়েছে। একজন অসুস্থ, মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করা মানুষ—যার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন উন্নত চিকিৎসা—তিনি আজ কারাগারে বন্দি।

এখানেই উঠে আসে মৌলিক প্রশ্ন—রাষ্ট্রের মানবিকতা কোথায়?
আইনের শাসন কি কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ?

মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, “একজন গুরুতর অসুস্থ ব্যক্তিকে যথাযথ চিকিৎসা না দিয়ে কারাগারে রাখা শুধু অমানবিকই নয়, এটি মৌলিক মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।” আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতিমালায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে—যে কোনো আটক ব্যক্তির চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু বাস্তবে সেই নীতির প্রতিফলন কোথায়?

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, “জামিন কোনো দয়া নয়—এটি আইনি অধিকার, বিশেষ করে যখন অভিযুক্ত ব্যক্তি গুরুতর অসুস্থ।” প্রশ্ন উঠছে—আদালত কেন এই বিষয়টি যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছে না? আইনের চোখে সবাই সমান—এই বহুল প্রচলিত নীতিটি কি এখন শুধুই বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ?

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও বিষয়টিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, “যখন একটি রাষ্ট্র ভিন্নমত বা প্রতিপক্ষকে দমনে মানবিকতার সীমা অতিক্রম করে, তখন তা কেবল ব্যক্তিগত অন্যায় নয়—বরং রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তির ওপর আঘাত।” আজ তৌহিদ তুহিন, কাল হয়তো অন্য কেউ—এই আশঙ্কা এখন সাধারণ মানুষের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ছে।

সাধারণ জনগণের প্রতিক্রিয়াও গভীরভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। অনেকেই বলছেন, “একজন গুরুতর অসুস্থ মানুষকে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা কোনো অনুগ্রহ নয়—এটি রাষ্ট্রের ন্যূনতম দায়িত্ব।” কেউ কেউ আফসোস করে বলেছেন, “আমরা যাদের সমর্থন করেছি, যাদের জন্য আন্দোলন করেছি—আজ তাদের কাছ থেকেই যদি মানবিকতার অভাব দেখি, তাহলে আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে আছি?”

এই ঘটনায় একটি বড় বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—মানুষ এখন ন্যায়বিচার ও মানবিকতার জন্য আকুল হয়ে উঠেছে। তারা এমন একটি রাষ্ট্র চায়, যেখানে রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত হবে।

ইতিহাস আমাদের বারবার শিক্ষা দিয়েছে—অন্যায়ের ওপর দাঁড়িয়ে কোনো শাসনব্যবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। ক্ষমতা দিয়ে ভয় দেখানো যায়, কিন্তু মানুষের হৃদয় জয় করা যায় না। আর জনগণের আস্থা হারালে রাষ্ট্রের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।

তৌহিদ তুহিনের ঘটনা শুধু একজন ব্যক্তির দুর্ভোগ নয়—এটি আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থার এক নির্মম প্রতিচ্ছবি। এই প্রতিচ্ছবি আমাদের বিবেককে প্রশ্ন করে, আমাদের নীরবতাকে চ্যালেঞ্জ জানায়।

আজ সময় এসেছে বিবেকের কাছে ফিরে যাওয়ার।
মানবিকতা, ন্যায়বিচার ও আইনের শাসনকে আবার সামনে নিয়ে আসার।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই—
রাষ্ট্র কি মানুষের জন্য, নাকি মানুষ রাষ্ট্রের নিষ্ঠুরতার বলি হওয়ার জন্য?


ad728

আলোচিত শীর্ষ ১০ সংবাদ