যুদ্ধবিরতিতে ট্রাম্প: এড়ালেন সংঘাত, তবে দিতে হচ্ছে চড়া রাজনৈতিক মূল্য


FavIcon
প্রতিদিনের কণ্ঠস্বর ডেক্সঃ
  • প্রকাশিত : ১০ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
জেনারেট ফটোকার্ড

ছবির ক্যাপশন:


এনামুল হক রাশেদী | আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ওয়াশিংটন ডি.সি. — খাদের কিনারা থেকে ফিরে এল মধ্যপ্রাচ্য। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একক সিদ্ধান্তে ইরানের সাথে সম্ভাব্য একটি প্রলয়ঙ্করী যুদ্ধ এড়ানো সম্ভব হয়েছে। গত মঙ্গলবার রাতে দুই সপ্তাহের এক নাটকীয় যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছেন ট্রাম্প। তবে এই সমঝোতা তাকে তাৎক্ষণিক সামরিক সংকট থেকে মুক্তি দিলেও, বিশ্বমঞ্চে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি এবং দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তাকে বড় ধরনের চড়া মূল্য দিতে হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

হুমকি থেকে সমঝোতা: নাটকীয় কয়েক ঘণ্টা

​গত মঙ্গলবার সকালেও পরিস্থিতি ছিল চরম উত্তপ্ত। ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, সমঝোতা না হলে কয়েক হাজার বছরের পুরনো ইরানি সভ্যতাকে চিরতরে ধ্বংস করে দেওয়া হবে। ওয়াশিংটন সময় রাত ৮টার মধ্যে চুক্তি না হলে ইরানের জ্বালানি ও যোগাযোগ অবকাঠামোয় বড় ধরনের হামলার সময়সীমাও বেঁধে দিয়েছিলেন তিনি।

​তবে সময়সীমা শেষ হওয়ার মাত্র ৮৮ মিনিট আগে, সন্ধ্যা ৬টা ৩২ মিনিটে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প নাটকীয় পরিবর্তনের আভাস দেন। তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি ‘চূড়ান্ত’ শান্তি চুক্তির পথে অনেক দূর এগিয়েছে এবং আলোচনার স্বার্থেই এই দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি।

হরমুজ প্রণালি ও যুদ্ধবিরতির শর্ত

​যুদ্ধবিরতির প্রাথমিক শর্ত হিসেবে ইরানকে সব ধরনের সংঘাত বন্ধ করতে হয়েছে। বিশেষ করে বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম ধমনী হরমুজ প্রণালি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য পুরোপুরি খুলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তেহরান। যদিও ইরান স্পষ্ট করে জানিয়েছে, এই জলপথের ওপর তাদের সার্বভৌম কর্তৃত্ব বজায় থাকবে।

​"আজ রাতে একটি আস্ত সভ্যতা বিলীন হয়ে যেতে পারে।" — ট্রাম্পের এই চরম উস্কানিমূলক মন্তব্য তাকে এক কঠিন সমীকরণের সামনে দাঁড় করিয়েছিল। হয় তাকে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে জড়াতে হতো, নতুবা নিজের অবস্থান থেকে সরে এসে সমালোচনার মুখে পড়তে হতো। তিনি দ্বিতীয়টিই বেছে নিয়েছেন।


বাজারের প্রতিক্রিয়া ও দুই সপ্তাহের চ্যালেঞ্জ

​যুদ্ধবিরতির ঘোষণার সাথে সাথেই বিশ্ব অর্থনীতিতে স্বস্তির সুবাতাস বইতে শুরু করেছে:

  • তেলের বাজার: আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেল প্রতি $১০০ ডলারের নিচে নেমে এসেছে।
  • শেয়ার বাজার: ওয়াল স্ট্রিটসহ মার্কিন শেয়ারবাজারের সূচকে বড় উত্থান লক্ষ্য করা গেছে।

​তবে আগামী ১৪ দিন হবে অগ্নিপরীক্ষা। দুই দেশ স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছাতে পারবে কি না, তা নিয়ে সংশয় কাটছে না।

অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সমালোচনার ঝড়

​ট্রাম্পের ‘সভ্যতা ধ্বংসের’ হুমকির কঠোর সমালোচনা হচ্ছে খোদ ওয়াশিংটনে।

  • ডেমোক্র্যাট প্রতিক্রিয়া: সিনেটর চাক শুমার হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, এই যুদ্ধংদেহী মনোভাবের জন্য চরম মূল্য দিতে হবে। কংগ্রেস সদস্য জ্যাকুইন ক্যাস্ট্রো প্রেসিডেন্টের মানসিক সুস্থতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন।
  • রিপাবলিকান শিবিরে ফাটল: দলীয় নেতাদের মধ্যেও অসন্তোষ স্পষ্ট। জর্জিয়ার অস্টিন স্কট এবং উইসকনসিনের রন জনসন একে 'বিরাট ভুল' হিসেবে অভিহিত করেছেন। লিজা মারকুয়াস্কিও ট্রাম্পের এই আক্রমণাত্মক অবস্থানের কড়া সমালোচনা করেছেন।

ইরানের অবস্থান ও ১০ দফা দাবি

​ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সায়্যিদ আব্বাস আরগাছি জানিয়েছেন, তারা আপাতত ‘প্রতিরক্ষামূলক অভিযান’ স্থগিত রাখছেন। তবে তার দাবি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের দেওয়া ১০ দফা প্রস্তাবের মূল কাঠামো মেনে নিয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে:

  1. ​মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার।
  2. ​ইরানের ওপর থেকে সকল নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার।
  3. ​যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ প্রদান।
  4. ​হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা।

উপসংহার: সাময়িক স্বস্তি নাকি শান্তির পথ?

​বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি কেবল একটি সাময়িক বিরতি। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত এবং হুতি বিদ্রোহীদের ওপর তেহরানের প্রভাবের মতো মৌলিক ইস্যুগুলো এখনো অমীমাংসিত। ট্রাম্প কি শেষ পর্যন্ত একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তি করতে পারবেন, নাকি এই দুই সপ্তাহ কেবল আরও বড় কোনো ঝড়ের পূর্বাভাস—তা দেখতে মুখিয়ে আছে বিশ্ববাসী।



ad728

আলোচিত শীর্ষ ১০ সংবাদ