রসনা তৃপ্তির আড়ালে দেশজুড়ে নীরব মহামারী; চিকিৎসকদের চরম উদ্বেগ
___________________________________
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা:
বিকেলের আড্ডায় ধোঁয়া ওঠা মচমচে শিঙাড়া, বন্ধুদের সাথে লোভনীয় কাচ্চি বিরিয়ানি, কিংবা মন ভালো করতে এক টুকরো চকোলেট পেস্ট্রি—বাঙালি জীবনে উৎসব আর আবেগের আরেক নাম খাবার। জিভের ডগায় এক মুহূর্তের সেই স্বাদ আমাদের মনে যে অনাবিল আনন্দ দেয়, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু কখনো কি গভীরভাবে ভেবে দেখেছেন, এই সাময়িক আনন্দের আড়ালে আমরা নিজেরাই নিজেদের শরীরের ভেতর এক নিঃশব্দ ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছি? চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় যা আসলে এক ধরণের "স্বেচ্ছায় অঙ্গহানি"।
আমরা প্রতিদিন অত্যন্ত যত্নে, ভালোবেসে যে সব প্রক্রিয়াজাত ও অতিরিক্ত তেল-মসলাযুক্ত খাবার খাচ্ছি, তা কীভাবে আমাদের অজান্তেই শরীরের একেকটি অতিপ্রয়োজনীয় অঙ্গকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে, তার একটি সুস্পষ্ট ও বাস্তবচিত্র এখানে তুলে ধরা হলো:
আমাদের লিভার বা যকৃৎ হলো শরীরের প্রধান পরিচ্ছন্নতাকর্মী। কিন্তু আমরা যখন প্রতিনিয়ত ফাস্টফুড, ডালডা, অতিরিক্ত তেল ও ময়দা দিয়ে তৈরি খাবার খাই, তখন লিভার সেই চর্বির বোঝা আর সামলাতে পারে না। অতিরিক্ত ফ্যাট লিভারের কোষে কোষে জমা হতে থাকে। চিকিৎসকরা একে বলছেন নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ (NAFLD)। একটা সময় যে লিভার পুরো শরীরের বিষাক্ত উপাদান ছেঁকে বের করে দিত, সেই লিভার নিজেই চর্বির নিচে চাপা পড়ে অকেজো হয়ে যায়, যা পরবর্তীতে লিভার সিরোসিসের মতো মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনে। এটি লিভারের এক ধরণের নীরব অকালমৃত্যু।
চিপস, বার্গার, চাটনি কিংবা বিভিন্ন মুখরোচক খাবারে স্বাদ বাড়ানোর জন্য ব্যবহার করা হয় প্রচুর পরিমাণে সোডিয়াম ও টেস্টিং সল্ট। এই উপাদানগুলো আমাদের রক্তচাপকে এক লাফে অনেকটা বাড়িয়ে দেয়। অতিরিক্ত রক্তচাপের কারণে কিডনির ভেতরের সূক্ষ্ম ছাঁকনিগুলো (নেফ্রন) ছিঁড়ে বা নষ্ট হয়ে যেতে শুরু করে। ফলে কিডনি তার স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা হারায়। শরীর থেকে বর্জ্য বের হতে না পেরে মানুষ ধীরে ধীরে ডায়ালিসিসের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। সামান্য একটু নোনতা স্বাদের জন্য নিজের দুটি কিডনিকে বিকল করে দেওয়া কি অঙ্গহানির চেয়ে কম কিছু?
কোमल পানীয় (কোল্ড ড্রিংকস), প্যাকেটজাত জুস কিংবা মিষ্টি খাবারে যে রিফাইনড বা পরিশোধিত চিনি থাকে, তা খাওয়ার সাথে সাথে রক্তে চিনির ঝড় বয়ে যায়। এই চিনিকে নিয়ন্ত্রণ করতে আমাদের প্যানক্রিয়াস বা অগ্ন্যাশয়কে দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে ইনসুলিন তৈরি করতে হয়। কিন্তু প্রতিদিনের এই চিনির অত্যাচার সহ্য করতে করতে একসময় প্যানক্রিয়াস ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং ইনসুলিন তৈরি করা বন্ধ করে দেয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় যার নাম 'টাইপ-২ ডায়াবেটিস'। ডায়াবেটিস হওয়া মানে শরীরের প্রতিটি অঙ্গের ক্ষয় ও অকেজো হওয়ার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হওয়া।
মুখরোচক খাবার মুচমুচে ও সুস্বাদু করতে যে 'ট্রান্স ফ্যাট' বা পোড়া তেল ব্যবহার করা হয়, তা আমাদের রক্তে ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের (LDL) মাত্রা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এই চর্বি হৃদপিণ্ডের রক্তবাহী ধমনীগুলোর দেয়ালে দেয়ালে জমা হয়ে রক্ত চলাচল বন্ধ করে দেয়, যাকে আমরা বলি ‘হার্ট অ্যাটাক’। একটি সুস্থ-সবল হার্টকে এভাবে চর্বির দেয়ালে বন্দি করে ফেলা কি এক ধরণের আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নয়?
বিশেষজ্ঞের সতর্কতা:
চিকিৎসকদের মতে, "আমরা অনেকেই ভাবি, 'একটু খেলে কী আর হবে?' কিংবা 'জীবন তো একটাই, খেয়ে মরি!' কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই খাবারগুলো আমাদের একবারে মেরে ফেলে না। বরং তিল তিল করে আমাদের অঙ্গগুলোকে পঙ্গু করে দেয়। জিভের স্বাদ থাকে বড়জোর কয়েক সেকেন্ড, কিন্তু একটি বিকল অঙ্গের কষ্ট বইতে হয় বছরের পর বছর, পুরো পরিবারকে সাথে নিয়ে।"
খাবারের আনন্দকে আমরা জীবন থেকে বাদ দেব না, তবে তা হতে হবে সুনিয়ন্ত্রিত ও পরিমিত:
জীবন সুন্দর এবং এই শরীরটি প্রকৃতির এক অনন্য উপহার। সামান্য জিভের তৃপ্তির জন্য নিজের লিভার, কিডনি বা হার্টকে চিরতরে বিকল করে দেওয়ার মতো ভুল সিদ্ধান্ত আর নয়। আজই সচেতন হোন, কারণ সুস্থ শরীরের চেয়ে বড় কোনো মাধুর্য আর এই পৃথিবীতে নেই।
আপনার মতামত লিখুন :