গণমাধ্যমকর্মী শাপলা আক্তারের লিখিত অভিযোগে তদন্ত কমিটি গঠন ও প্রতিবেদন দাখিল; শরীফুল আলমের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের পক্ষে মেলেনি সুনির্দিষ্ট প্রমাণ
____________________________________________
অনুসন্ধানী প্রতিবেদক:
বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) কর্মচারী প্রধান (সিওপি) আ ন ম শরীফুল আলমকে ঘিরে সাম্প্রতিক অভিযোগ ও বিতর্কের নেপথ্যে উঠে এসেছে দাপ্তরিক তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। বিসিআইসির সদ্য অবসরপ্রাপ্ত পরিচালক (পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন) মোঃ দেলোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে গণমাধ্যমকর্মী শাপলা আক্তারের লিখিত অভিযোগের পর তদন্ত কমিটি গঠন এবং প্রতিবেদন দাখিলকে কেন্দ্র করেই মূলত বিরোধের সূত্রপাত। পরবর্তী সময়ে ওই তদন্ত কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত শরীফুল আলমের বিরুদ্ধে নিয়োগ-বদলি বাণিজ্য, প্রভাব বিস্তার ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মতো গুরুতর অভিযোগ তোলা হয়। কিন্তু জাতীয় সাপ্তাহিক তদন্ত রিপোর্টের অনুসন্ধানে এসব অভিযোগের সমর্থনে সুনির্দিষ্ট ও গ্রহণযোগ্য তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
বিসিআইসির সরকারি তথ্য অনুযায়ী, মোঃ দেলোয়ার হোসেন ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে পরিচালক (পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন) পদে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছিলেন। এর আগে বিসিআইসির ২২ ডিসেম্বর ২০২৪ তারিখের কর্মকর্তাদের ক্যাডার তালিকায় তাঁকে সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার (গ্রেড-২) হিসেবে উল্লেখ করা হয়। সরকারি তালিকায় তাঁর বিসিআইসিতে যোগদানের তারিখ ৮ জুলাই ১৯৯৭। ফোরামের আবেদনে তাঁকে প্রায় ৩০ বছরের অভিজ্ঞ কর্মকর্তা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আবেদন অনুযায়ী, তিনি ১৬ জুলাই ২০২৬ তারিখে অবসরে যান এবং অবসরের আগে পরিচালক (পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, দেলোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে গত ২০ জুলাই ২০২৬ তারিখে গণমাধ্যমকর্মী শাপলা আক্তার বিসিআইসি কর্তৃপক্ষের কাছে একটি লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন। অভিযোগে বিভিন্ন অনিয়ম ও অসংগতির বিষয়ে নির্দিষ্ট তথ্য তুলে ধরা হয়। ওই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিসিআইসি কর্তৃপক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে। আ ন ম শরীফুল আলমের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত তদন্ত কার্যক্রম শেষে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। অর্থাৎ, তদন্তের সূচনা কোনো অজ্ঞাত বা বেনামি অভিযোগের ভিত্তিতে নয়; বরং একজন পরিচয়যুক্ত গণমাধ্যমকর্মীর স্বাক্ষরিত লিখিত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে।
তদন্ত কমিটি গঠন ও প্রতিবেদন দাখিলের পর বিষয়টি নিয়ে বিসিআইসি জাতীয়তাবাদী অফিসার্স ফোরামের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ফোরামের সাধারণ সম্পাদক মোঃ আবদুল মতিন গত ১৯ আগস্ট ২০২৬ তারিখে শিল্প সচিবের কাছে আ ন ম শরীফুল আলমের বিরুদ্ধে অভিযোগসংবলিত একটি লিখিত আবেদন করেন। ওই আবেদনে তদন্ত কমিটি গঠন ও কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি শরীফুল আলমের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ উত্থাপন করা হয়। তদন্তের পদ্ধতি, কমিটির সদস্য নির্বাচন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়েও আপত্তি জানানো হয়।
ফোরামের আবেদনে তদন্তের সূত্র হিসেবে বেনামি অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০ জুলাইয়ের মূল অভিযোগটি ছিল গণমাধ্যমকর্মী শাপলা আক্তারের স্বাক্ষরিত লিখিত অভিযোগ। ফলে অভিযোগটি বেনামি ছিল—আবেদনের এমন বক্তব্যের সঙ্গে প্রাপ্ত তথ্যের অসংগতি দেখা যায়। এ বিষয়ে ফোরামের সাধারণ সম্পাদক মোঃ আবদুল মতিনের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি বলে অনুসন্ধানী দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
শরীফুল আলমের বিরুদ্ধে নিয়োগ-বদলি বাণিজ্য, প্রভাব খাটানো ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগের বিষয়েও অনুসন্ধানী দল সরেজমিনে তথ্য সংগ্রহ করে। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলা, অভিযোগের পক্ষে নথিপত্র ও সুনির্দিষ্ট তথ্য চাওয়া এবং প্রাপ্ত বক্তব্য যাচাই করা হয়। কিন্তু এসব অভিযোগের সত্যতা প্রতিষ্ঠার মতো গ্রহণযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফোরামের নেতারাও অভিযোগগুলোর পক্ষে নির্দিষ্ট নথি, প্রত্যক্ষ তথ্য কিংবা যাচাইযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি।
অন্যদিকে, শরীফুল আলমের দাবি, তিনি সরকারি বিধিবিধান অনুসরণ করে দাপ্তরিক দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তাঁর বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ তোলা হচ্ছে, সেগুলো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং ব্যক্তিগত স্বার্থসংশ্লিষ্ট একটি পক্ষের অপপ্রচারের অংশ বলে তিনি মনে করেন। তাঁর ভাষ্য, কোনো রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা ব্যক্তিগত প্রভাব নয়, বরং দাপ্তরিক দায়িত্ব ও প্রতিষ্ঠানের স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়েই তিনি কাজ করেছেন।
ফোরামের শিল্প সচিব বরাবর দেওয়া আবেদনে দেলোয়ার হোসেনের চাকরিজীবনের বিভিন্ন ঘটনা, তাঁর বিরুদ্ধে অতীতের মামলা ও চাকরিতে পুনর্বহালের বিষয়ও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব বিষয়ে আবেদনে দেওয়া বক্তব্যের স্বাধীন যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের সত্যতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একইভাবে শরীফুল আলমের বিরুদ্ধে উত্থাপিত গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রেও প্রমাণ উপস্থাপন জরুরি। অনুসন্ধানী দলের কাছে এখন পর্যন্ত সেসব অভিযোগের সমর্থনে গ্রহণযোগ্য নথি বা তথ্য আসেনি।
সব মিলিয়ে দাপ্তরিক নথি, অভিযোগের প্রেক্ষাপট, তদন্ত কমিটি গঠন ও প্রতিবেদন দাখিলের তথ্য, সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য এবং ফোরামের আবেদনের বিষয়বস্তু বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শাপলা আক্তারের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে বিসিআইসির দাপ্তরিক তদন্ত কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছিল। সেই তদন্তকে কেন্দ্র করেই পরবর্তী সময়ে শরীফুল আলমের বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযোগ সামনে আসে। তবে অনুসন্ধানে তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর সত্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। নতুন কোনো নির্ভরযোগ্য নথি বা প্রমাণ সামনে এলে বিষয়টি পুনরায় যাচাইয়ের সুযোগ থাকবে।
অনুসন্ধানী টিমের মূল্যায়ন:
দাপ্তরিক তদন্তের প্রেক্ষাপট স্পষ্ট, শরীফুল আলমের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণ মেলেনি
একজন সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিয়োগ-বদলি বাণিজ্য, প্রভাব বিস্তার কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের মতো অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। এ ধরনের অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে আবেগ, ব্যক্তিগত বিরোধ কিংবা সাংগঠনিক পরিচয়ের চেয়ে প্রমাণ ও দাপ্তরিক নথিই হওয়া উচিত প্রধান বিবেচ্য।
বিসিআইসির কর্মচারী প্রধান আ ন ম শরীফুল আলমের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ, ফোরামের শিল্প সচিব বরাবর দেওয়া আবেদন, গণমাধ্যমকর্মী শাপলা আক্তারের মূল লিখিত অভিযোগ, তদন্ত কমিটি গঠনের প্রেক্ষাপট, প্রতিবেদন দাখিলের তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পর্যালোচনা করে অনুসন্ধানী দলের কাছে প্রতীয়মান হয়েছে যে, শরীফুল আলমের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর সত্যতা প্রতিষ্ঠার মতো সুনির্দিষ্ট ও গ্রহণযোগ্য প্রমাণ নেই। অভিযোগ উত্থাপনকারী পক্ষের কাছেও এসব অভিযোগের সমর্থনে প্রত্যক্ষ তথ্য বা যাচাইযোগ্য নথি চাওয়া হলেও তা উপস্থাপন করা সম্ভব হয়নি।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দেলোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে তদন্তের সূত্রপাত হয়েছিল গণমাধ্যমকর্মী শাপলা আক্তারের স্বাক্ষরিত লিখিত অভিযোগের মাধ্যমে। অথচ পরবর্তী সময়ে ওই অভিযোগকে বেনামি হিসেবে উল্লেখ করে তদন্ত কার্যক্রমের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্যের সঙ্গে এই বক্তব্যের অসংগতি রয়েছে। ফলে তদন্ত কমিটি গঠনের প্রকৃত প্রেক্ষাপট বিবেচনা না করে শরীফুল আলমের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপনের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
অনুসন্ধানী দলের মূল্যায়ন, বিদ্যমান তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আ ন ম শরীফুল আলমের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো প্রমাণিত নয়। বরং দাপ্তরিক তদন্ত কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিরোধের পর তাঁর বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযোগ সামনে এসেছে। তবে এই মূল্যায়ন অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য ও নথিপত্রের ভিত্তিতে; এটি কোনো আদালত বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের বিকল্প নয়। ভবিষ্যতে নতুন ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া গেলে তা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা হবে।
অনুসন্ধানী টিমের অভিমত:
অভিযোগের ভার অভিযোগকারীর ওপরই বর্তায়। প্রমাণ ছাড়া কোনো কর্মকর্তার পেশাগত সততা ও ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ করা সমীচীন নয়।