ছয় লাখ টাকার বদলি চুক্তির অভিযোগ, কুরিয়ার রসিদে ডিএফও এমএ হাসানের নাম—প্রশ্নের মুখে অর্থের উৎস ও উদ্দেশ্য, তদন্তের আশ্বাস বন সংরক্ষকের
____________________________________________
নিজস্ব প্রতিবেদক:
চট্টগ্রাম উপকূলীয় বন বিভাগে বদলিকে কেন্দ্র করে ছয় লাখ টাকার কথিত চুক্তি, কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে এক লাখ টাকা পাঠানোর তথ্য এবং সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ ঘিরে প্রশ্নের মুখে পড়েছে বদলি ও পদায়ন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা। অভিযোগের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ নথি হিসেবে সামনে এসেছে এসএ পরিবহনের একটি পার্সেল বুকিং রসিদ। এতে চট্টগ্রাম অঞ্চলের উপবন সংরক্ষক ও উপকূলীয় বন বিভাগের অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এমএ হাসানের নাম, মোবাইল নম্বর এবং এক লাখ টাকা পাঠানোর তথ্য উল্লেখ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকেও রসিদটি সঠিক বলে জানানো হয়েছে।
তবে রসিদে অর্থ পাঠানোর তথ্য থাকলেও এর প্রকৃত উদ্দেশ্য, অর্থের চূড়ান্ত প্রাপক এবং কথিত বদলি চুক্তির সঙ্গে এর যোগসূত্র এখনো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে এমএ হাসান প্রথমে অর্থ গ্রহণের কথা অস্বীকার করেন। পরে রসিদের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা দিয়ে বলেন, ‘মিডিয়া ট্রায়ালে তো আমি, এমএ হাসানকে অসৎ বানানো হয়েছে? আপনারা নিউজ করেন, কোনো সমস্যা নেই—আমি কী বলব।’ পাশাপাশি তিনি পারিবারিক কারণে ছুটিতে থাকার কথা জানান। তবে পরবর্তী প্রশ্নগুলোর আর কোনো জবাব দেননি তিনি।
ছয় লাখ টাকার কথিত চুক্তি, কুরিয়ারে এক লাখ
সংশ্লিষ্ট বন বিভাগের একাধিক কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, উপকূলীয় বন বিভাগের একটি রেঞ্জে বদলিকে কেন্দ্র করে একজন রেঞ্জ কর্মকর্তার সঙ্গে এমএ হাসানের ছয় লাখ টাকার চুক্তি হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই কথিত চুক্তির অংশ হিসেবে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে এক লাখ টাকা পাঠানো হয় বলে দাবি করা হয়েছে। রসিদে প্রেরক হিসেবে বন বিভাগের একজন কর্মকর্তার নামও রয়েছে।
এ ঘটনায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—বদলি বা পদায়নকে কেন্দ্র করে আদৌ কোনো আর্থিক চুক্তি হয়েছিল কি না, হয়ে থাকলে কারা এতে জড়িত এবং কুরিয়ারে পাঠানো এক লাখ টাকার সঙ্গে কথিত ছয় লাখ টাকার চুক্তির সম্পর্ক কী?
এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে অর্থের উৎস, প্রেরক ও প্রাপকের পরিচয়, কুরিয়ারের বুকিং ও ডেলিভারি রেকর্ড এবং সংশ্লিষ্ট বদলির আদেশ যাচাই করা প্রয়োজন।
বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ, সামনে কুরিয়ার রসিদ:
কুরিয়ার রসিদটির সত্যতা যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়ে যোগাযোগ করা হলে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে রসিদটি সঠিক বলে জানানো হয়। তবে একটি রসিদ অর্থ পাঠানোর তথ্যের প্রাথমিক ভিত্তি হলেও তা এককভাবে ঘুষ লেনদেন কিংবা বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ প্রমাণ করে না।
এক রেঞ্জ কর্মকর্তা এমএ হাসানের কাছে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে টাকা পাঠানোর কথা স্বীকার করেছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। কিন্তু কী কারণে টাকা পাঠানো হয়েছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে অর্থ পাঠানোর ঘটনা এবং এর উদ্দেশ্য—দুটি বিষয় আলাদাভাবে যাচাই করা জরুরি।
‘নিজস্ব সিন্ডিকেটের’ অভিযোগ:
উপকূলীয় বন বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেন, এমএ হাসানের একটি নিজস্ব সিন্ডিকেট রয়েছে এবং চট্টগ্রাম বন বিভাগের বিভিন্ন কার্যক্রমে তাঁর উল্লেখযোগ্য প্রভাব রয়েছে। ওই কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, বন সংরক্ষক মিহির কুমার দের সঙ্গে এমএ হাসানের পূর্বপরিচয় ও পেশাগত সম্পর্ক রয়েছে।
ওই কর্মকর্তা আরও দাবি করেন, ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে অর্থ লেনদেন হলে তার রেকর্ড থেকে যায়। এ কারণে কর্মচারী, আত্মীয়স্বজন ও মধ্যস্থতাকারীদের ব্যবহার করে কুরিয়ারসহ বিকল্প পদ্ধতিতে অর্থ আদান-প্রদানের ঘটনা ঘটে থাকে। বাগান সৃজন প্রকল্পের অর্থ লেনদেনেও এমন পদ্ধতি ব্যবহারের অভিযোগ করেন তিনি।
তবে কথিত সিন্ডিকেট পরিচালনা, প্রভাব খাটানো কিংবা বদলি বাণিজ্যে সংশ্লিষ্টতার এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য নথি ও প্রমাণ প্রয়োজন। অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট আর্থিক রেকর্ড এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করা জরুরি।
প্রশ্নের মুখে ডিএফওর জবাব: ‘মিডিয়া ট্রায়ালে অসৎ বানানো হয়েছে’
অভিযোগগুলোর বিষয়ে বক্তব্য জানতে এমএ হাসানকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে খুদে বার্তা পাঠিয়ে তাঁর বক্তব্য জানতে চাওয়া হলে তিনি জবাবে লেখেন, “মিডিয়া ট্রায়ালে তো আমি, এমএ হাসানকে অসৎ বানানো হয়েছে? আপনারা নিউজ করেন কোন সমস্যা নেই আমি কি বলবো।”
একই বার্তায় তিনি জানান, “আমি বর্তমানে সদর দপ্তরের বাইরে আছি। আমার শ্বশুর গত মাসে মারা গেছেন। তাঁর মিলাদসহ বিবিধ পারিবারিক প্রয়োজনে ছুটিতে আছি।”
তবে কুরিয়ার রসিদে নিজের নাম ও এক লাখ টাকার তথ্য থাকার বিষয়টি, অর্থ পাঠানোর উদ্দেশ্য এবং কথিত ছয় লাখ টাকার চুক্তির অভিযোগ সম্পর্কে তিনি সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দেননি। এ বিষয়ে পরবর্তী সময়ে একাধিক বার্তা পাঠিয়েও আর কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। ফলে এসব অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বিস্তারিত বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
এমএ হাসানের বক্তব্যে অভিযোগের প্রতিবাদ এবং পারিবারিক কারণে ছুটিতে থাকার বিষয়টি উঠে এলেও আর্থিক লেনদেনসংক্রান্ত নির্দিষ্ট প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়া যায়নি। তবে তাঁর বক্তব্য বা নীরবতা রহস্যজনক বলে মনে হয়েছে।
তদন্তের আশ্বাস বন সংরক্ষকের:
চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক মিহির কুমার দের কাছে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এমএ হাসান তাঁর অধীনে সুন্দরবনে কাজ করেছেন, এটি সত্য। তবে এমএ হাসান তাঁর ‘ডান হাত’ ছিলেন—এমন দাবি সঠিক নয় বলে জানান তিনি।
কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে টাকা লেনদেনের অভিযোগ প্রসঙ্গে মিহির কুমার দে বলেন, “এ ধরনের ঘটনা ঘটে থাকলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
বন সংরক্ষকের এ বক্তব্যের পর এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তদন্তেই বেরিয়ে আসতে পারে প্রকৃত সত্য:
কুরিয়ার রসিদে উল্লিখিত এক লাখ টাকা কী উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়েছিল? কথিত ছয় লাখ টাকার চুক্তির সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না? বদলি বা পদায়নের সিদ্ধান্তে কোনো আর্থিক লেনদেন প্রভাব ফেলেছিল কি না? অভিযোগে উল্লিখিত ব্যক্তিদের ভূমিকা কী ছিল?
এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানের বুকিং ও ডেলিভারি রেকর্ড, অর্থের উৎস, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং বদলি-পদায়নের প্রশাসনিক নথি পর্যালোচনা করে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।
বন বিভাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানে বদলি ও পদায়ন নিয়ে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠলে তার স্বচ্ছ নিষ্পত্তি জরুরি। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যদিকে, কুরিয়ার রসিদ, কথিত আর্থিক চুক্তি ও বদলি প্রক্রিয়ার মধ্যকার যোগসূত্র অনুসন্ধান করে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করাই এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।