প্রতিদিনের কণ্ঠস্বর ডেক্সঃ
অনুসন্ধানী প্রতিবেদন | দ্বিতীয় পর্ব
অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর সাংবাদিকদের হুমকির অভিযোগ; "নিউজ করে কিছুই হবে না"—বিতর্কে কুঞ্জ মহিপুর বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক
______________________________________
নিজস্ব প্রতিবেদক | গাইবান্ধা
জাতীয় সাপ্তাহিক তদন্ত রিপোর্ট-এ কুঞ্জ মহিপুর দ্বি-মুখী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের নিয়োগ অনিয়ম, জাল স্বাক্ষরের অভিযোগ, শিক্ষার্থী উপস্থিতির প্রশ্ন এবং অর্থ লেনদেন সংক্রান্ত প্রথম পর্বের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। এবার অনুসন্ধানী প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আসাদুজ্জামানের বিরুদ্ধে সাংবাদিকদের ভয়ভীতি ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে নিয়োগ বাতিল হওয়া এক সহকারী শিক্ষক প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে অর্থ গ্রহণ ও প্রতারণার অভিযোগ পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
প্রতিবেদক ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের অভিযোগ, সংবাদ প্রকাশের পর প্রধান শিক্ষক বিভিন্ন ব্যক্তির মাধ্যমে সাংবাদিকদের উদ্দেশে অসন্তোষ প্রকাশ করেন এবং সংবাদ প্রকাশ অব্যাহত রাখলে পরিণতি ভালো হবে না—এমন ইঙ্গিতপূর্ণ বক্তব্য দেন। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি বলেন, "নিউজ করে আমার কিছুই করতে পারবে না। আমি ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক। গত ১৭ বছরেও কেউ আমার কিছু করতে পারেনি, এখনও কেউ কিছু করতে পারবে না।"
অভিযোগকারী সূত্রের দাবি, এসব বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি নিজের রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবের কথা উল্লেখ করে সাংবাদিকদের মধ্যে ভীতি সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন। তবে এ বক্তব্যের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি এবং বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তসাপেক্ষ।
"৬ লাখ টাকা দিয়েও চাকরি রক্ষা হলো না—সহকারী শিক্ষক হারুনুর রশিদের অভিযোগ
প্রথম পর্বের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর জাতীয় সাপ্তাহিক তদন্ত রিপোর্ট-এর অনুসন্ধানী টিম নিয়োগ বাতিল হওয়া সহকারী শিক্ষক মো. হারুনুর রশিদ (মিলন)-এর সঙ্গে বিস্তারিত কথা বলে। তিনি প্রধান শিক্ষক মো. আসাদুজ্জামানের বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করেন।
হারুনুর রশিদ দাবি করেন, প্রধান শিক্ষক মো. আসাদুজ্জামানের আশ্বাস ও প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে তিনি ৬ লাখ টাকা প্রদান করে কুঞ্জ মহিপুর দ্বি-মুখী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি জানতে পারেন, তার নিয়োগসহ আরও ছয়জন শিক্ষক-কর্মচারীর নিয়োগ বোর্ডের নথিতে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (ডিজি) প্রতিনিধি এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধির স্বাক্ষর জাল করার অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে এলে নথি যাচাই-বাছাই শেষে সাতটি নিয়োগ বাতিল ঘোষণা করা হয়। এর ফলে সাতজন শিক্ষক-কর্মচারীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে।
তিনি বলেন, "আমরা সাতজন শিক্ষক-কর্মচারী প্রধান শিক্ষকের কথায় বিশ্বাস করে চাকরিতে যোগ দিয়েছিলাম। কিন্তু পরে জানতে পারি নিয়োগ বোর্ডের নথিতে গুরুতর অনিয়ম ও জাল স্বাক্ষরের অভিযোগ রয়েছে। শেষ পর্যন্ত আমাদের নিয়োগ বাতিল হয়ে যায়। এতে আমাদের জীবনে চরম অনিশ্চয়তা নেমে এসেছে। আমরা দিনের পর দিন প্রতারণার শিকার হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছি।
আবেগঘন কণ্ঠে তিনি আরও বলেন, "আমি একজন ক্যান্সার রোগী। শারীরিকভাবে অসুস্থ থাকা সত্ত্বেও ন্যায়বিচারের আশায় বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরছি। প্রধান শিক্ষক আমার সঙ্গেও একই ধরনের প্রতারণা করেছেন বলে আমি অভিযোগ করছি। আমি গাইবান্ধা জেলা শিক্ষা অফিস, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, রংপুর বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)সহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছি। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, আজ পর্যন্ত আমার কোনো অভিযোগের কার্যকর তদন্ত হয়েছে বলে জানতে পারিনি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এই নীরবতা আমাকে এবং আমার মতো ক্ষতিগ্রস্তদের আরও হতাশ করেছে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, সময়মতো অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হলে প্রকৃত ঘটনা অনেক আগেই উদঘাটিত হতো এবং সাতজন শিক্ষক-কর্মচারীকে দীর্ঘদিন অনিশ্চয়তা ও মানবেতর জীবনযাপন করতে হতো না।
সাংবাদিকতা থামাতে চাপের অভিযোগ:
স্থানীয় সাংবাদিক ও সচেতন মহলের অভিমত, কোনো অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে আপত্তি থাকলে তার জবাব তথ্য-প্রমাণ ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেওয়াই গণতান্ত্রিক পন্থা। সংবাদ প্রকাশকে কেন্দ্র করে সাংবাদিকদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য উদ্বেগজনক।
স্থানীয়দের মতে, প্রথম পর্বে উত্থাপিত নিয়োগ অনিয়ম, জাল স্বাক্ষর, অর্থ লেনদেন এবং শিক্ষার্থী উপস্থিতি সংক্রান্ত অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়ার আগেই যদি সংবাদ প্রকাশে বাধা দেওয়ার চেষ্টা হয়ে থাকে, তবে পুরো বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা উচিত।
এদিকে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের অভিযোগ, বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরও দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও দৃশ্যমান কোনো তদন্ত বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা না নেওয়ায় তারা চরম হতাশার মধ্যে রয়েছেন।
বক্তব্য পাওয়া যায়নি:
এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রধান শিক্ষক মো. আসাদুজ্জামানের বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রশাসন, জেলা প্রশাসন এবং তদন্তকারী সংস্থার প্রতি এলাকাবাসী, ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষক-কর্মচারী ও সচেতন নাগরিকদের দাবি—বিদ্যালয়কে ঘিরে ওঠা সকল অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে সত্য উদঘাটন করা হোক এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
জাতীয় সাপ্তাহিক তদন্ত রিপোর্ট-এর ধারাবাহিক অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে।
পরবর্তী পর্বে থাকছে: স্বাক্ষর জালিয়াতির অভিযোগ, নিয়োগ বোর্ডের নথির আরও অসঙ্গতি, কথিত অর্থ লেনদেনের বিস্তারিত তথ্য এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য।
(চলবে...)