নিয়োগ বাতিলের সরকারি নথি, লাখ লাখ টাকা ঘুষ গ্রহণের লিখিত অভিযোগ এবং ভুয়া ছাত্রীদের দিয়ে পরীক্ষার নামে মহাজালিয়াতি—শিক্ষাব্যবস্থার মূলে কুঠারাঘাত; ধারাবাহিক অনুসন্ধানের দ্বিতীয় কিস্তিতে আরও ভয়াবহ তথ্য ফাঁস
_________________________________________
নিজস্ব প্রতিবেদক | গাইবান্ধা
গাইবান্ধার সাদুল্যাপুর উপজেলার কুঞ্জ মহিপুর দ্বি-মুখী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়কে ঘিরে তৈরি হয়েছে এক নজিরবিহীন শিক্ষাক্ষয়ী ও দুর্নীতি। বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক মো. আসাদুজ্জামানের প্রত্যক্ষ মদদে নিয়োগ জালিয়াতি, নথি কারসাজি, শিক্ষার্থী সংকট এবং অর্থ লেনদেনের মতো গুরুতর অনিয়ম নিয়ে জনমনে চরম ক্ষোভ ও আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। প্রাপ্ত অভিযোগপত্র, সরকারি নথি এবং সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য বিশ্লেষণে বিদ্যালয়টি পরিণত হয়েছে দুর্নীতির এক আখড়ায়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রধান শিক্ষক আসাদুজ্জামান বছরের পর বছর ধরে বিদ্যালয়ের বিভিন্ন শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগ প্রক্রিয়াকে নিজেদের ব্যক্তিগত বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন। সহকারী শিক্ষক (সামাজিক বিজ্ঞান), অফিস সহকারী, নৈশপ্রহরী ও আয়া— প্রতিটি পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত রেজুলেশন, খসড়া প্যাড এবং নিয়োগ-সংক্রান্ত নথিপত্র নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। নথিপত্র যাচাই-বাছাইয়ের পর এসব নিয়োগ প্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়ে ওঠে চরম আপত্তি।
অভিযোগ রয়েছে, নিয়োগ বোর্ডে উপস্থিত থাকার কথা ছিল— এমন ডিজি'র প্রতিনিধি, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি এবং অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর অবলীলায় জাল করে নিয়োগ-সংক্রান্ত নথি প্রস্তুত ও দাখিল করা হয়। এই জালিয়াতির মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন দেখানো হলেও, পরবর্তীতে বিষয়টি নজরে এলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তা পর্যালোচনা করে এবং অন্তত সাতটি নিয়োগ বাতিল করতে বাধ্য হয়। এই নির্লজ্জ জালিয়াতির ফলে অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে দীর্ঘদিন ধরে চাকরির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকা সাতজন শিক্ষক ও কর্মচারীর ভবিষ্যৎ।
নিচে যাদের নিয়োগ বাতিল হয়েছে বলে সরকারি নথিতে উল্লেখ রয়েছে:
১. মো. হারুন-অর-রশিদ, সহকারী শিক্ষক (সামাজিক বিজ্ঞান)
২. মো. আতিকুর রহমান, সহকারী শিক্ষক (সামাজিক বিজ্ঞান)
৩. এ.জি.এম. মোস্তাক আহমেদ, সহকারী শিক্ষক (সামাজিক বিজ্ঞান)
৪. মোছা. ছাবিনা ইয়াসমিন, সহকারী শিক্ষক (সামাজিক বিজ্ঞান)
৫. মো. জাকিরুল ইসলাম, অফিস সহকারী
৬. মো. রফিকুল ইসলাম, নৈশপ্রহরী
৭. মোছা. ছামছুন্নাহার, আয়া
জালিয়াতি এখানেই শেষ নয়। বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. হারুন-অর-রশিদ কর্তৃক প্রধান শিক্ষক মো. আসাদুজ্জামানের বিরুদ্ধে দাখিলকৃত একটি লিখিত অভিযোগ আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এনেছে। অভিযোগকারী শিক্ষক দাবি করেছেন, তাকে চাকরিতে স্থায়ীকরণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রধান শিক্ষক তার নিকট থেকে ৬ লাখ টাকা ঘুষ গ্রহণ করেছেন। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সুবিধা না পাওয়ায় তিনি তার অর্থ ফেরতও পাননি। শুধু এই একটি অভিযোগ নয়, স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, বিদ্যালয়টিতে বিভিন্ন সময়ে শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগকে কেন্দ্র করে প্রধান শিক্ষক কোটি টাকারও বেশি অর্থ লেনদেন করেছেন, যা রীতিমতো লুণ্ঠন।
সবচেয়ে ভয়াবহ অভিযোগটি এসেছে শিক্ষার্থী উপস্থিতি নিয়ে। প্রতিবেদক দল একাধিক দিন বিদ্যালয় ও আশপাশের এলাকায় সরেজমিনে অবস্থান করেও বিদ্যালয়ে কোনো ছাত্রী উপস্থিতি দেখতে পায়নি। স্থানীয়দের অভিযোগ, বাস্তবে শিক্ষার্থী সংকট থাকলেও প্রধান শিক্ষক আসাদুজ্জামান কাগজ-কলমে ভুতুড়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা দেখিয়ে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন এবং রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে সরকারি অনুদান হাতিয়ে নিচ্ছেন। এমনকি, বিভিন্ন কোচিং সেন্টারের শিক্ষার্থীদের অর্থের বিনিময়ে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে দেখিয়ে এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করানোর মতো জঘন্য প্রক্রিয়াও চালু রাখার অভিযোগ উঠেছে।
শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিমহলের প্রশ্ন, যেখানে শিক্ষার্থী উপস্থিতি নিয়েই গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে, সেখানে ধারাবাহিকভাবে একাধিক শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগের প্রয়োজনীয়তা কীভাবে সৃষ্টি হলো? একই সঙ্গে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় জাল স্বাক্ষর ও নথি কারসাজির অভিযোগ যদি সত্য হয়, তাহলে এর দায়ভার প্রধান শিক্ষক আসাদুজ্জামান এড়াতে পারেন কি?
অভিযোগগুলো অত্যন্ত গুরুতর এবং এটি শুধুমাত্র প্রশাসনিক অনিয়ম নয়; বরং পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং সরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়ার ওপর জন-আস্থার জন্য চরম হুমকি।
এলাকাবাসীর জোর দাবি, অবিলম্বে এই পুরো ঘটনাটির নিরপেক্ষ ও উচ্চ পর্যায়ের তদন্তের মাধ্যমে উদঘাটন করা হোক, প্রকৃত দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক এবং ক্ষতিগ্রস্তদের বিষয়েও যথাযথ সিদ্ধান্ত নেওয়া হোক।
অভিযোগের বিষয়ে প্রধান শিক্ষক মো. আসাদুজ্জামানের বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা হবে।
প্রাপ্ত সরকারি নথি, অভিযোগপত্র, সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য এবং সরেজমিন অনুসন্ধানের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করা হয়েছে।
জাতীয় সাপ্তাহিক তদন্ত রিপোর্ট-এর ধারাবাহিক অনুসন্ধান অব্যাহত থাকবে। আগামী পর্বে থাকছে— সভাপতি স্বাক্ষর জালিয়াতির আরও নতুন প্রমাণ, নিয়োগ বোর্ডের নথিতে ভয়াবহ অসঙ্গতি, কথিত অর্থ লেনদেনের আরও বিস্তারিত তথ্য এবং বিদ্যালয় পরিচালনার নামে নৈরাজ্য সৃষ্টি নিয়ে বিস্ফোরক অনুসন্ধান।
(চলবে...)