বিশেষ প্রতিনিধি, নেত্রকোনা:
ময়মনসিংহ রেঞ্জের অধীনস্থ ৩৬টি থানার মধ্যে নেত্রকোনা জেলার দুটি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের (ওসি) ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক যেন কিছুতেই থামছে না। জেলা দুটির কলমাকান্দা ও কেন্দুয়া থানায় মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে ৪ জন ওসির ঘনঘন বদলি, নতুন পদায়ন এবং ক্লোজড (প্রত্যাহার) হওয়ার ঘটনায় জেলাজুড়ে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা। পুলিশের এমন নজিরবিহীন ও অস্থির সিদ্ধান্ত নিয়ে সাধারণ মানুষ এবং রাজনৈতিক সচেতন মহলের মনে জন্ম দিয়েছে নানা প্রশ্ন।
স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের অভিযোগ, মেধা, সততা ও যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়নের পরিবর্তে অন্য কোনো বিশেষ সুবিধা বা সমীকরণের মাধ্যমে কিছু সুবিধাভোগী বিতর্কিত কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ চেয়ারে বসানো হচ্ছে। ফলে ভেঙে পড়ছে চেইন অব কমান্ড, আর সাধারণ মানুষের মধ্যে পুলিশি সেবা নিয়ে তৈরি হচ্ছে তীব্র উদ্বেগ।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কলমাকান্দা ও কেন্দুয়া থানায় সাম্প্রতিক সময়ে ওসির চেয়ারে যে রদবদল হয়েছে, তা সাধারণ বা রুটিন বদলির পর্যায়ে পড়ে না। মাত্র ৯০ দিনের ব্যবধানে ৪ বার পরিবর্তনের ঘটনা প্রশাসনিক অস্থিতিশীলতাকেই নির্দেশ করে। কোনো একজন কর্মকর্তা এসে এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বুঝে ওঠার আগেই তাকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে, আবার কোনো কোনো বিতর্কিত কর্মকর্তাকে তড়িঘড়ি করে চেয়ারে বসানো হচ্ছে।
এলাকাবাসীর মতে, একটি থানার ওসি হলেন মাঠপর্যায়ে সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধান দর্পণ। কিন্তু কলমাকান্দা ও কেন্দুয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ ও সীমান্তসংলগ্ন (কলমাকান্দা) এলাকায় কেন এত ঘনঘন পরিবর্তন, তার কোনো সদুত্তর মিলছে না খোদ জেলা পুলিশ প্রশাসনের কাছ থেকেও।
স্থানীয়দের পক্ষ থেকে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলা হচ্ছে, বদলি ও পদায়নের ক্ষেত্রে যোগ্যতার চেয়ে ‘লবিং’ এবং ‘বিশেষ সুবিধা’ গ্রহণের বিষয়টিই এখন মূল নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে। যোগ্যতা ও সততা থাকা সত্ত্বেও দক্ষ কর্মকর্তারা কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন, আর তদবিরের জোরে গুরুত্বপূর্ণ থানার দায়িত্ব পেয়ে যাচ্ছেন বিতর্কিতরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক বাসিন্দা জানান:
"থানায় ওসি বদলি হওয়া স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু ৩ মাসে যদি ৪ বার ওসি বদলাতে হয়, তবে বুঝতে হবে ডাল মে কুছ কালা হ্যায়। এভাবে চললে অপরাধীরা পার পেয়ে যাবে আর সাধারণ মানুষ হয়রানির শিকার হবে।"
প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞদের মতে, পুলিশের মাঠপর্যায়ের এত দ্রুত ও আকস্মিক পরিবর্তন সরাসরি প্রভাব ফেলে সাধারণ মানুষের আইনি সেবার ওপর। নতুন একজন ওসি এসে এলাকার অপরাধ প্রবণতা, মাদক সিন্ডিকেট বা মামলাগুলোর তদন্তের গভীরতা বোঝার আগেই যদি বদলি হয়ে যান, তবে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। এতে পুলিশের ভেতরের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা যেমন নষ্ট হচ্ছে, তেমনি সাধারণ মানুষের আস্থা কমছে সামগ্রিক পুলিশ প্রশাসনের ওপর।
নেত্রকোনার সচেতন নাগরিক সমাজের দাবি, ময়মনসিংহ রেঞ্জের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের এই বিষয়টি খতিয়ে দেখা উচিত। কলমাকান্দা ও কেন্দুয়া থানায় কেন এত দ্রুত রদবদল করতে হলো এবং এর পেছনে কোনো অদৃশ্য হাত বা অনৈতিক সুবিধা কাজ করেছে কিনা, তা তদন্তের আওতায় আনা জরুরি। পুলিশের সংস্কার ও জনগণের দোরগোড়ায় সঠিক সেবা পৌঁছে দিতে এই 'বদলি বাণিজ্য' ও 'অস্থির পদায়ন' বন্ধ করার দাবি এখন জোরালো হয়ে উঠেছে।