মোঃ মহিব উল্যাহ সোহেল | ঢাকা
নোয়াখালীর সুবর্ণচরের চরলক্ষ্মী গ্রামে প্রকাশ্যে এক নারী ও তার স্বামীকে বেধড়ক পেটানোর একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় উঠেছে। এই ঘটনা আবারও আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ ও রাজনীতির ভেতরের কদর্য রূপটিকে অনাবৃত করে দিয়েছে। দুই মাসের বকেয়া বেতন চাওয়া এবং নিজের মাছ ধরার জাল রক্ষা করার চেষ্টা করায় এক দিনমজুর দম্পতিকে যেভাবে পৈশাচিক নির্যাতন করা হয়েছে, তা মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানায়।
জনমনে প্রশ্ন উঠেছে, এই ঘটনা কি শুধুই একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ, নাকি আমাদের বিচারহীনতার সংস্কৃতির এক অনিবার্য বহিঃপ্রকাশ?
অভিযুক্ত সফিক স্থানীয় যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক। অভিযোগ রয়েছে, এই রাজনৈতিক পরিচয়টিকেই তিনি আইনের ঊর্ধ্বে ওঠার লাইসেন্স হিসেবে ব্যবহার করেছেন। একজন শ্রমজীবী মানুষের দুই মাসের বেতন আটকে রাখা, উল্টো তাকে ‘মাদকাসক্ত’ অপবাদ দেওয়া এবং পবিত্র ঈদের সময় একটি পরিবারকে অনাহারে রাখা—কোনো সভ্য সমাজে কল্পনা করা যায় না। এরপর যখন সেই অন্যায়ের প্রতিবাদ করা হলো, তখন লোহার রড দিয়ে প্রকাশ্যে পেটানোর এই দুঃসাহস তিনি কোথায় পান?
রাজনৈতিক দলগুলোর পদ-পদবি কি তবে সাধারণ মানুষকে শোষণ ও নির্যাতনের হাতিয়ার? প্রতিটি রাজনৈতিক দলকেই আজ এই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে। দল থেকে বহিষ্কার বা দায় এড়ানোর চেনা কৌশলে এবার আর পার পাওয়ার সুযোগ নেই; নিজ দলের কর্মীর অপকর্মের দায় সংশ্লিষ্ট নেতৃত্বকে নিতেই হবে।
ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর দেশজুড়ে নিন্দার ঝড় উঠলেও স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা চিরাচরিত আমলাতান্ত্রিক জড়তায় বন্দি। থানার পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, "এখনো কেউ লিখিত অভিযোগ দেয়নি।"
প্রশ্ন হলো—যে নারীকে প্রকাশ্যে রড দিয়ে পেটানো হলো, যার স্বামীকে রক্তাক্ত করা হলো, তার কি এই মুহূর্তে থানায় গিয়ে এজাহার দায়ের করার মতো শারীরিক বা মানসিক অবস্থা আছে? তারা কি আদৌ প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে মুখ খোলার মতো নিরাপদ বোধ করছেন? ডিজিটাল প্রযুক্তির এই যুগে পুলিশ কেন ভাইরাল হওয়া ভিডিওটিকে প্রাথমিক তথ্য (Suo Motu) হিসেবে গণ্য করে স্বপ্রণোদিত হয়ে মামলা করছে না? বিচার পেতে হলে ভুক্তভোগীকেই কেন বারবার ব্যবস্থার বেড়াজালে হেনস্তার শিকার হতে হবে? এই ‘লিখিত অভিযোগের’ ফাঁদেই মূলত বহু অপরাধী পার পেয়ে যায়।
ভিডিওটির সবচেয়ে ভয়ানক দিক হলো—যখন প্রকাশ্যে এই দম্পতিকে নির্যাতন করা হচ্ছিল, তখন চারপাশে বেশ কিছু মানুষ দাঁড়িয়ে তা দেখছিল, কেউ কেউ মুঠোফোনে ভিডিও করছিল। কিন্তু কেউ একজন এগিয়ে এসে মারধর থামানোর চেষ্টা করেনি।
এই ‘দর্শক’ হয়ে থাকার সংস্কৃতিটাই আজ সমাজকে গ্রাস করছে। ‘আমার তো ক্ষতি হচ্ছে না’—এমন আত্মকেন্দ্রিক ভাবনার খেসারত দিতে হচ্ছে পুরো জাতিকে। আজ যে লোহার রড তাসলিমা আক্তার খুকির ওপর নেমে এসেছে, সম্মিলিত প্রতিবাদ গড়ে না তুললে কাল তা যে কারও ঘাড়ে নেমে আসতে পারে।
এই বর্বরতার অবসান ঘটাতে দেশের সচেতন নাগরিক সমাজ সুনির্দিষ্ট তিনটি দাবি উত্থাপন করেছে:
নোয়াখালীর সুবর্ণচর অতীতেও নারীর প্রতি চরম বর্বরতার জন্য গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছে। আমরা আর কোনো ‘সুবর্ণচর’ দেখতে চাই না। একটি সভ্য ও স্বাধীন রাষ্ট্রে নিজের ঘামের মূল্য চাওয়ার অপরাধে কাউকে পিটিয়ে রক্তাক্ত করা হবে—তা মেনে নেওয়া যায় না। এই পৈশাচিকতার যদি দৃষ্টান্তমূলক বিচার না হয়, তবে এই রক্তের দাগ থেকে রাষ্ট্র বা নাগরিক—কেউই মুক্ত হতে পারবে না। বিবেকের আদালতে আমাদের প্রত্যেককেই অপরাধী হিসেবে দাঁড়াতে হবে।