মালিকুজ্জামান কাকা, বিশেষ প্রতিনিধি:
আওয়ামী লীগ আমলে ক্যাডার, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কিছুদিনের জন্য বিএনপি এবং বর্তমানে জামায়াত—এই বহুরূপী পরিচয়ে ঝিনাইদহের মহেশপুরে সক্রিয় রয়েছে একটি ভয়ঙ্কর ভূমিদস্যু চক্র। রাজনৈতিক খোলস বদলে এই চক্রটি এখনও সামাজিক নানা অপতৎপরতা ও জমি জবরদখল বজায় রেখেছে। আর এই চক্রটির অনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে ঢাল হিসেবে কাজ করার অভিযোগ উঠেছে খোদ পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)-এর এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।
বৃহত্তর যশোরের চৌগাছা সংলগ্ন মহেশপুর উপজেলার ১০ নং নাটিমা ইউনিয়নের ৮নং আলীপুর ওয়ার্ডে ঘটেছে এই ঘটনা। অভিযোগ উঠেছে, পিবিআই ঝিনাইদহ জেলার উপ-পুলিশ পরিদর্শক (নিরস্ত্র) মোঃ রিফাত ইমরান (বিপি নং- ৯২১৯২২৩৫৭৫) মোটা অঙ্কের ঘুষ বা উৎকোচের বিনিময়ে প্রকৃত জমির মালিকদের বিরুদ্ধে এবং জবরদখলকারীদের পক্ষে আদালতে মিথ্যা তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, মহেশপুর থানার সিআর নং- ৫৮৪/২৪ মামলার তদন্তভার পান পিবিআই কর্মকর্তা রিফাত ইমরান। গত ০৮/১২/২৫ তারিখে তিনি দণ্ডবিধির ৩৭৯/৫০৬ (দ্বিতীয় অংশ) ধারায় আদালতে একটি তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন (স্মারক নং- ১৫৬৩)।
বাস্তবতা হলো, এই মামলার মূল অভিযুক্ত ইছাহক আলী ও তার ছেলে আরিফ হোসেন ওই জমির প্রকৃত মালিক। ১৯৬৮ সালে জমিদারের কাছ থেকে দাখিলা মূলে ১৫ একর (৪৫ বিঘা) জমি বন্দোবস্ত নেন ঝিনাইদহ আলীপুরের জরিপ হোসেন, আব্দুর রাজ্জাক, আমীর হোসেন ও সাবিহা খাতুন। ১৯৯২ সালের ২৮ ডিসেম্বর রউশন আলীর স্ত্রী ও কিতাব আলী মুন্সীর মেয়ে সাবিহা খাতুন মারা যান। মায়ের সূত্রে ওয়ারেশ হিসেবে ১১ বিঘা সোয়া আট শতক জমি পান দুই ভাই—সুলতান ও ইছাহক আলী।
এই জমির মালিকানা নিয়ে মুন্সেফ কোর্ট, জজ কোর্ট, হাইকোর্ট এবং সুপ্রিম কোর্ট মিলিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে মোট ৯টি মামলায় রায় পেয়েছেন ইছাহক ও সুলতান। এমনকি মৎস্য বিভাগও তদন্ত করে ইছাহকের পক্ষেই রিপোর্ট দিয়েছে।
স্থানীয় গ্রামবাসী ও ভুক্তভোগী সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে মৃত আব্দুল লতিফের ছেলে দাউদ হোসেন, রবিউল হোসেন, মিজানুর হোসেন, বাবুল হোসেন এবং সোলাইমানের ছেলে শাহীন ওই জমি 'খাস জমি' দাবি করে জোরপূর্বক জবরদখল করে নেয়। এর মধ্যে ৯৩ নং ইদরাকপুর মৌজার ২০৫৪ খতিয়ানের এক একর ২৬ শতক এবং ২০৫৫ খতিয়ানের এক একর ৭৭ শতক জমি রয়েছে।
২০১৮ সাল থেকে এই আওয়ামী সন্ত্রাসীদের ভয়ে নিরীহ জমির মালিকরা নিজেদের জমিতে যেতে পারছিলেন না। দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ইছাহক আলী বাদী হয়ে মহেশপুর থানায় মামলা করেন, কারণ আসামিরা জোর করে তাদের জমির ধান কেটে নিয়ে ১ লাখ টাকার বেশি ক্ষতিসাধন করেছিল।
অভিযোগ উঠেছে, পিবিআই কর্মকর্তা মোঃ রিফাত ইমরান ক্ষমতার অপব্যবহার করে প্রকৃত মালিক পক্ষকে কোনো নোটিশ বা ডাকেননি। তিনি বাদীর আত্মীয়-স্বজনদের সাজানো সাক্ষী বানিয়ে এই মিথ্যা রিপোর্ট তৈরি করেছেন।
মামলার নিরপেক্ষ সাক্ষী হিসেবে যাদের দেখানো হয়েছে, তারা সবাই পরস্পর আত্মীয়। যেমন—কামাল (বাদীর ভাইপো), আনিস (মামাতো-ফুফাতো কুটুম), হালিম (ধর্ম ভাই) এবং মঞ্জুরুল ইসলাম (চাচাতো কুটুম)। অথচ, আলীপুর গ্রামের এই কথিত মাছ চুরির ঘটনা নাটিমা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবুল কাসেম মাস্টার কিংবা ৮নং ওয়ার্ডের মেম্বারও জানেন না। মূলত বাদী ও সাক্ষীরা পরস্পর যোগসাজশে এই মিথ্যা চুরির অভিযোগ তুলেছে, যা পিবিআই কর্মকর্তা রিফাত ইমরান অর্থের বিনিময়ে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।
আসামিপক্ষের আইনজীবী তবিবুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,
"জমির প্রকৃত মালিকপক্ষকে পিবিআই-এর দারোগা 'মাছ চোর' আখ্যা দিয়ে মিথ্যাকে সত্য বানানোর অপচেষ্টা করেছেন। আদালতের ৯টি রায় যাদের পক্ষে, তারা চোর হতে পারে না। আমরা এই পক্ষপাতমূলক ও মনগড়া রিপোর্টের বিরুদ্ধে আদালতে 'না-রাজি' (Naraji) পিটিশন দেওয়ার প্রক্রিয়া চালাচ্ছি।"
এ বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য পিবিআই কর্মকর্তা উপ-পুলিশ পরিদর্শক মোঃ রিফাত ইমরানের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি বা কোনো সাড়া দেননি।
প্রকৃত ভূমি মালিকদের দাবি, এই দুর্নীতিবাজ পিবিআই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত করা হোক এবং বহুরূপী ভূমিদস্যুদের হাত থেকে তাদের পৈতৃক সম্পত্তি উদ্ধার করা হোক।