প্রতিদিনের কণ্ঠস্বর ডেক্সঃ
পীরগঞ্জে ইটভাটার প্রস্তুতি: কাঠ পোড়ানোয় পরিবেশে বাড়ছে অশনিসংকেত
____________________________
ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলায় শীতের আগমনের সাথে সাথে ইটভাটাগুলো আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। মাঠসংলগ্ন খোলা স্থানে সারি সারি কাঠের স্তুপ ও উঁচু চিমনি দেখে বোঝা যাচ্ছে—ইট পোড়ানোর মৌসুম শুরু হতে আর খুব দেরি নেই। তবে এই প্রস্তুতির পেছনে লুকিয়ে আছে পরিবেশের জন্য এক গুরুতর হুমকি।
কাঠ জ্বালানি: পরিবেশ ও বনায়নের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি
আইন অনুযায়ী ইটভাটায় কাঠ ব্যবহার নিষিদ্ধ হলেও পীরগঞ্জের অনেক ভাটায় এখনও চোরাই বা অননুমোদিত কাঠ ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।
ফলে স্থানীয় বনভূমি, সামাজিক বনায়ন ও কৃষিজমির প্রাকৃতিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ অঞ্চলে গাছ শুধু পরিবেশের ভারসাম্যই রক্ষা করে না—মাটি ধরে রাখা, জলাধার সংরক্ষণ ও কৃষিকাজের জন্য প্রয়োজনীয় মাইক্রো-ইকোসিস্টেমও তৈরি করে।
এই গাছই যখন ভাটার চুল্লিতে পুড়তে থাকে, তখন প্রকৃতি দীর্ঘমেয়াদে হুমকির মুখে পড়ে।
বায়ুদূষণ: শীতে ‘স্মগ’ সৃষ্টি করে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে
শীত মৌসুমে কুয়াশার সাথে ভাটার ধোঁয়া মিশে তৈরি হয় ভয়ঙ্কর স্মগ, যা শিশু, বৃদ্ধ ও অ্যাজমা–রোগীদের জন্য বিশেষ হুমকি।
চিমনি থেকে নির্গত কার্বন মনোক্সাইড, সালফার ডাই-অক্সাইড, PM2.5 ও PM10 কণা সরাসরি ফুসফুসে জমে দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসযন্ত্রের রোগ সৃষ্টি করে।
স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর তথ্যমতে, পীরগঞ্জে প্রতি শীতেই শ্বাসতন্ত্রজনিত রোগ ২৫–৩০% বৃদ্ধি পায়—যার বড় একটি অংশ ইটভাটার ধোঁয়ার সাথে সম্পর্কিত।
কৃষিজমির উর্বরতা কমে যাচ্ছে
ইটভাটায় মাটি সরবরাহের ফলে উর্বর কৃষিজমি ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বর্ষাকালে এসব খননকৃত স্থানে পানি জমে ছোটখাটো জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়, আর শুকনো মৌসুমে জমি চাষাবাদের অনুপযোগী হয়ে পড়ে।
গত কয়েক বছরের স্যাটেলাইট ও স্থানীয় পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে—পীরগঞ্জের কয়েকটি ইউনিয়নে ভাটার জন্য মাটি কেটে ১২–১৭% উৎপাদনশীল জমি নষ্ট হয়েছে।
শ্রমিকদের নিরাপত্তাহীনতা উদ্বেগ বাড়াচ্ছে
ইটভাটা শ্রমিকরা গরম চুল্লির তাপ, ধুলাবালু ও অনিরাপদ কর্মপরিবেশে প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেন। মাঠে স্তূপ করে রাখা কাঠের পাশে কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা বা সুরক্ষা উপকরণ না থাকা শ্রমিকদের জীবনঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তোলে।
টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন কঠোর নজরদারি
পীরগঞ্জে ইটভাটার প্রস্তুতি স্থানীয় অর্থনীতিকে সক্রিয় করলেও এর পরিবেশগত মূল্য অত্যন্ত চড়া।
টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে প্রয়োজন—
পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবহার
কাঠ পোড়ানো বন্ধে কড়া নজরদারি
অনুমোদিত স্থানে ভাটা স্থাপন
জিগ-জ্যাগসহ আধুনিক প্রযুক্তির বাধ্যতামূলক ব্যবহার
অন্যথায় ইটভাটার ধোঁয়া ও কাঠ পোড়ানোর ফলে বর্তমান প্রজন্মের সাথে সাথে ভবিষ্যৎ প্রজন্মও মারাত্মক পরিবেশগত বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।
আসাদুজ্জামান
ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি