প্রতিদিনের কণ্ঠস্বর ডেক্সঃ
অমানবিকতার অন্ধকারে সমাজের বিবেক কোথায়?
____________________________
পাবনার ঈশ্বরদীতে আটটি নিরীহ কুকুরছানা হত্যার ঘটনা যেন কেবল একটি স্থানীয় অপরাধ নয়—এটি আমাদের সমাজের মানবিক বিবেকের সামনে একটি নির্মম আয়না তুলে ধরেছে। মানুষ ও প্রাণীর সহাবস্থান সভ্যতার প্রথম শর্ত। অথচ মাতৃদুগ্ধপায়ী শিশু-প্রাণীদের বস্তাবন্দি করে পুকুরে ডুবিয়ে হত্যা করার মতো অমানবিকতা কেবল আইনি অপরাধই নয়—এটি মানুষের অন্তর্গত ক্রুরতার নগ্ন ঘোষণা।
ঘটনাটি প্রশ্ন তোলে—এই সমাজে প্রাণীর জীবন কতটা মূল্যহীন? কেন এখনও প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা ‘‘তুচ্ছ ঘটনা’’ হিসেবে অবহেলিত হয়? কেন আমরা মনে করি, অসহায় প্রাণীর আর্তনাদ আমাদের দায়িত্বের আওতায় পড়ে না?
রাষ্ট্রযন্ত্রের দ্রুত সাড়া কিছুটা আশার আলো দেখালেও এটি একই সঙ্গে আমাদের সামাজিক বাস্তবতার কঠিন সত্যকেও সামনে আনে। দেশে প্রাণী কল্যাণ আইন ২০১৯ আছে, প্রাণিসম্পদ বিভাগ আছে, সরকারি কোয়ার্টারে বসবাসের নিয়মকানুন আছে—তবুও একজন নারী কীভাবে নির্দ্বিধায় এমন অমানবিক আচরণ করতে পারেন? কেন তিনি বিশ্বাস করেছিলেন যে এ ঘটনার কোনো পরিণতি হবে না? এর উত্তর সমাজের গভীর মানসিক কাঠামোতেই—যেখানে প্রাণী নির্যাতনকে এখনও গুরুত্বহীন, বিরক্তিকর বা ‘‘অতি সাধারণ ব্যাপার’’ হিসেবে দেখা হয়।
প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আক্তারের সরাসরি ‘‘অমানবিক’’ মন্তব্য কেবল প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতা নয়—এটি দেশের ভাবমূর্তি এবং সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের তীব্র ইঙ্গিত। সরকারি আবাসিক এলাকায় এমন নির্মমতা ঘটাই প্রমাণ করে, মানবিক দায়িত্ববোধ সামগ্রিকভাবে কতটা ক্ষয়িষ্ণু হয়েছে।
মামলা হয়েছে—এটি স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয়। কিন্তু এর চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—সমাজ কি জেগেছে?
আইন তার পথে চলবে, আসামি কোয়ার্টার ছাড়বে, তদন্ত হবে—কিন্তু মানুষের বিবেক কি পরিবর্তিত হবে? ভবিষ্যতে অন্য কোনো প্রাণীর ওপর নির্যাতনের ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে আমরা কি একইভাবে প্রতিবাদী হব? নাকি কিছুদিন পরই আমরা আবারো স্বাভাবিক উদাসীনতায় ফিরে যাব?
অভিযুক্তের দাবি—তিনি নাকি ছানাগুলোকে পুকুরে ফেলেননি; শুধু ব্যাগে ভরে পুকুরের পাশে রেখে এসেছেন। প্রশ্ন হলো—এমন অরক্ষিত অবস্থায় শিশুপ্রাণীদের ফেলে যাওয়াই কি মৃত্যুর সমান নয়? যে আচরণে মৃত্যু নিশ্চিত—তা কি হত্যার দায় থেকে মুক্তি দিতে পারে?
এই ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনরোষ, এনিমেল রাইটস কর্মীদের উপস্থিতি, প্রশাসনের দ্রুত ব্যবস্থা—সবই ইতিবাচক। কিন্তু এ ক্ষোভ কতদিন স্থায়ী হবে? মানবিকতা কি শুধুই ক্ষণস্থায়ী আবেগ? নাকি সামাজিক পরিবর্তনের ভিত্তি?
সরকারি কোয়ার্টার রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব ও শৃঙ্খলার প্রতিচ্ছবি। সেখানে বসবাসকারীদের আচরণ রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি বহন করে। তাই অভিযুক্ত পরিবারকে কোয়ার্টার ছাড়ার নির্দেশ কেবল প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়—এটি মানবিক অবস্থানেরও ঘোষণা।
তবে আইন প্রয়োগ বা বাহ্যিক পদক্ষেপই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন—
মানবিক সচেতনতা, সামাজিক শিক্ষা ও নৈতিক পুনর্জাগরণ।
কারণ আইনের ভয় পরিবর্তন আনে না—মানবিক চেতনার আলোই পারে অমানুষিকতা দূর করতে।
আটটি কুকুরছানা কেবল প্রাণী ছিল না; তারা ছিল মাতৃত্বের ছায়ায় থাকা অবুঝ প্রাণ। তাদের আর্তনাদ কেউ শোনেনি, কিন্তু তাদের মৃত্যু দেশের মানুষকে কাঁপিয়েছে। এই কাঁপুনি যেন থেমে না যায়।
এই ঘটনা আমাদের সামনে যে প্রশ্নটি রেখে গেছে—
আমরা কি সত্যিই মানুষ?
আমরা কি সত্যিকার অর্থে একটি সহানুভূতিশীল সমাজ গড়তে পেরেছি?
আমরা যদি চাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি মানবিক দেশ উপহার দিতে, তবে এই ছোট ছোট কিন্তু গভীর মানবিক ঘটনাগুলোর প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিই পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে।
বাংলাদেশ যেন প্রাণী হত্যার দেশে পরিণত না হয়—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
আমরা চাই—
সহমর্মিতার বাংলাদেশ। মানবিক বাংলাদেশ।
আটটি কুকুরছানার মৃত্যু সেই পরিবর্তনের প্রথম ধ্বনি হোক—এটাই প্রত্যাশা।